জাপান বিশ্বের অন্যতম উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দেশ হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে সংক্রামক ব্যাধি হামের (Measles) ক্রমবর্ধমান বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের মুখে পড়েছে। ২০১৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জাপানকে ‘হামমুক্ত’ দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে দেশটি আবারও এই ভাইরাসের ঝুঁকিতে রয়েছে। জাপানের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ইনস্টিটিউট এবং দেশটির জাতীয় গণমাধ্যম এনএইচকে (NHK)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ভাগেই দেশটিতে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে।
Table of Contents
সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান
২০২৪ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত জাপানে মোট ৪৩৬ জন হামে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। গত এক দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৯ সালে দেশটিতে সর্বোচ্চ ৭৪৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। বর্তমান সংক্রমণের হার সেই রেকর্ডকে স্পর্শ করার পথে রয়েছে এবং এটি গত ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংক্রমণের ঘটনা। যদিও আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে স্বস্তির বিষয় এই যে এখন পর্যন্ত জাপানে হামের কারণে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
জাপানের ভৌগোলিক সংক্রমণের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানী টোকিও এবং এর পার্শ্ববর্তী তিনটি জেলা হামের মূল হটস্পট হয়ে উঠেছে। এই নির্দিষ্ট অঞ্চলে ১৮৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা পুরো দেশের মোট সংক্রমণের প্রায় অর্ধেক। এছাড়া অন্যান্য কিছু জেলাতেও গুচ্ছাকার সংক্রমণের (Cluster infection) খবর পাওয়া গেছে।
সংক্রমণের উৎস ও কারণ বিশ্লেষণ
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, জাপানে এই ভাইরাসের পুনরায় প্রবেশের মূল কারণ আন্তর্জাতিক ভ্রমণ। বিদেশফেরত জাপানি নাগরিক অথবা পর্যটকদের মাধ্যমে এই ভাইরাস দেশটিতে প্রবেশ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে নিউজিল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা যাত্রীদের মাধ্যমে ভাইরাসের বিস্তারের প্রমাণ পাওয়া গেলেও বর্তমানে এই তালিকা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
জাপানে সংক্রমণের কারণসমূহ নিচে সারণিবদ্ধ করা হলো:
| ক্রমিক | সংক্রমণের মূল কারণসমূহ | বিস্তারিত তথ্য |
| ১ | বিদেশ থেকে ভাইরাসের প্রবেশ | আন্তর্জাতিক পর্যটক ও বিদেশফেরত নাগরিকদের মাধ্যমে সংক্রমণ। |
| ২ | টিকাদানের হার হ্রাস | কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে দ্বিতীয় ডোজের টিকাদানের হার ৯৫% এর নিচে। |
| ৩ | রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস | বয়স্কদের মধ্যে সময়ের সাথে সাথে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া। |
| ৪ | গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা | দীর্ঘ সময় বড় প্রাদুর্ভাব না থাকায় প্রাকৃতিকভাবে ইমিউনিটি গড়ে না ওঠা। |
টিকাদান কর্মসূচি ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
জাপানে ২০০৬ সাল থেকে দুই ডোজের নিয়মিত হামের টিকাদান কর্মসূচি চালু রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, শিশুর বয়স এক বছর পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশের আগের বছর দ্বিতীয় ডোজ প্রদান করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, দুই ডোজের এই টিকা হামের বিরুদ্ধে ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করে। তবে জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার হার লক্ষ্যমাত্রা (৯৫ শতাংশ) অর্জন করতে পারছে না, যা ভাইরাসের বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আক্রান্তদের বয়স। বাংলাদেশে সাধারণত শিশুরা হামে বেশি আক্রান্ত হলেও জাপানে বয়স্কদের নিয়ে উদ্বেগ বেশি। মূলত যারা শৈশবে মাত্র এক ডোজ টিকা পেয়েছিলেন অথবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বয়সের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে, তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
বর্তমানে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় জাপানের সাধারণ মানুষের মধ্যে টিকা নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে জাপানি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নিয়মিত সময়সূচীর বাইরে বা বয়স্কদের টিকা নিতে হলে নিজস্ব অর্থ ব্যয় করতে হয়। বর্তমান বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির বাজারে এই খরচ সাধারণ মানুষকে টিকা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সরকারকে কোভিড-১৯ টিকার মতো হামের টিকাও সাময়িকভাবে বিনামূল্যে বা সরকারি অর্থায়নে প্রদানের পরামর্শ দিয়েছেন। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হলে আবারও এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
