‘আমার জামাই, নাতিন আর পুতিও মইরা গেছে, সব হারাইছি। আমার সব শেষ গো, আল্লাহ গো।’ স্বজন হারানোর শোকে এভাবেই বিলাপ করছিলেন ৭০ বছর বয়সী রহিমা বেগম। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জামাতা, নাতনি, নাতনির পাঁচ বছরের ছেলে ও বেয়াইনকে হারিয়ে তিনি যেন বাকরুদ্ধ। স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু কোনোভাবেই থামছিল না তাঁর কান্না।
শুক্রবার সকালে প্রিয়জনদের বিদায় দিয়েছিলেন রহিমা বেগম। তাঁদের গন্তব্য ছিল গাজীপুর। মা, মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে মোফাজ্জাল হোসেনেরও ছিল স্বাভাবিক একটি যাত্রা—নান্দিনা থেকে ময়মনসিংহ, এরপর বাসে করে গাজীপুর। কিন্তু সেই যাত্রাই শেষ হয়ে যায় ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনায়।
শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরের রহমতপুর বাইপাস সড়কের দাপুনিয়া হাড়গুজির পাড় এলাকায় রাজীব পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশার চালকসহ সাতজন নিহত হন। নিহতদের ছয়জন জামালপুরের বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন।
নিহত চারজন হলেন জামালপুর সদর উপজেলার দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মোফাজ্জাল হোসেন (৫৫), তাঁর মা রাশিদা বেগম (৮৫), মেয়ে মর্জিনা (২৫) এবং মর্জিনার পাঁচ বছরের ছেলে মিনাল। নিহত অপর দুজন হলেন একই ইউনিয়নের বীর গোবিন্দবাড়ী গ্রামের সুজন আলী (৩৪) এবং নান্দিনা বাদেচান্দি গ্রামের আকরাম আলী (৪৮)। নিহত অপর নারী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
দুর্ঘটনার খবর পৌঁছানোর পর থেকেই দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মোফাজ্জাল হোসেনের বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। শুক্রবার সন্ধ্যার পর বাড়িটিতে ভিড় করেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। কেউ পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন, কেউ আবার নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
মোফাজ্জাল হোসেন পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন। স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের হোতাপাড়া এলাকায় থাকতেন তিনি। মা রাশিদা বেগম ও বিবাহিত মেয়ে মর্জিনাকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুর্ঘটনার আগের দিন জামালপুরের বাড়িতে এসেছিলেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের গাজীপুরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাই ছিল তাঁর।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মোফাজ্জাল তাঁর মা রাশিদা বেগম, দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মর্জিনা ও নাতি মিনালকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। নান্দিনা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ময়মনসিংহ যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। এরপর ময়মনসিংহ থেকে বাসে করে গাজীপুরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ঘটে দুর্ঘটনা। রহমতপুর বাইপাস সড়কের দাপুনিয়া হাড়গুজির পাড় এলাকায় রাজীব পরিবহনের বাসটির সঙ্গে অটোরিকশাটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে একই পরিবারের চারজনসহ সাতজন প্রাণ হারান।
মোফাজ্জালের ভাবি ইসমতারা বলেন, তাঁর দেবর দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। মা, ভাতিজি ও নাতিকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্যই আগের দিন বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। মর্জিনা তখন দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। একসঙ্গে পরিবারের চারজনকে হারানোর ঘটনা তাঁদের জন্য মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
বাড়ির উঠানে বসে জামাতার স্মৃতিচারণা করছিলেন রহিমা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তাঁর প্রয়োজনের সময় জামাতা মোফাজ্জাল হোসেন পাশে থাকতেন। তাঁকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে দিতেন। পরিবারের নাতি-নাতনিরাও তাঁকে খুব ভালোবাসত। সেই প্রিয় মানুষগুলোর একসঙ্গে চলে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি।
মর্জিনার মৃত্যুতে শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গভীর বেদনা। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। একই দুর্ঘটনায় তাঁর পাঁচ বছরের ছেলে মিনালেরও মৃত্যু হয়েছে। ফলে মা-মেয়ে ও নাতির পাশাপাশি পরিবারের আরও এক প্রজন্মের স্বপ্নও যেন একসঙ্গে থেমে গেছে।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রানা অভিযোগ করেন, রাজীব পরিবহনের বাসের কারণে এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। একই পরিবারের চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজনের মৃত্যুতে ময়মনসিংহ ও জামালপুর—দুই এলাকাতেই শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। তবে দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের শোকের মাত্রা আরও গভীর। একসঙ্গে একই পরিবারের চারজনকে হারিয়েছে একটি পরিবার। তাঁদের মধ্যে ছিলেন একজন প্রবীণ নারী, একজন কর্মজীবী পুরুষ, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে এবং মাত্র পাঁচ বছরের এক শিশু।
স্বজনদের কাছে এই মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি একটি পরিবারের একসঙ্গে বহু সম্পর্ক হারানোর গল্প। শুক্রবার সকালে যাঁদের বিদায় দেওয়া হয়েছিল গাজীপুরের উদ্দেশে, কয়েক ঘণ্টা পর তাঁদেরই মরদেহের অপেক্ষায় বসতে হয়েছে স্বজনদের। রহিমা বেগমের কান্নায় তাই বারবার ফিরে আসছে একটাই কথা—‘সব হারাইছি।’









