,

আট বছর পর বেঙ্গালুরুতে এআর রহমানের সুরের মুগ্ধতা

দীর্ঘ আট বছর পর বেঙ্গালুরুতে ফিরে সংগীতপ্রেমীদের জন্য স্মরণীয় এক রাত উপহার দিলেন ভারতের জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক ও শিল্পী এআর রহমান। শনিবার রাতে শহরের হোয়াইটফিল্ডের কেটিপিও গ্রাউন্ডসে ‘দ্য ওয়ান্ডারমেন্ট ট্যুর’-এর কনসার্টে প্রায় তিন ঘণ্টা গান পরিবেশন করেন তিনি। শুরু থেকেই দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর ছিল পুরো অনুষ্ঠানস্থল।

‘লাফিং ওয়াটার এন্টারটেইনমেন্ট’ ও ‘নয়েজ অ্যান্ড গ্রেইনস’-এর আয়োজনে হওয়া এই কনসার্টটি ছিল রহমানের ২০২৬ সালের ভারত সফরের সূচনা পর্ব। দীর্ঘ বিরতির পর প্রিয় শিল্পীকে আবার সরাসরি মঞ্চে দেখার সুযোগ পাওয়ায় দর্শকদের মধ্যে ছিল বাড়তি আগ্রহ। নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠান শুরু হওয়ায় সেই প্রত্যাশা দ্রুত রূপ নেয় উৎসবে।

কনসার্টের গানের তালিকায় স্থান পেয়েছিল রহমানের তামিল ও হিন্দি সিনেমার বেশ কিছু জনপ্রিয় গান। স্থানীয় দর্শকদের জন্য ছিল বিশেষ চমকও। ‘রোজা’ সিনেমার একটি জনপ্রিয় গান কন্নড় ভাষায় পরিবেশন করা হয়। এতে অনুষ্ঠানটি বেঙ্গালুরুর শ্রোতাদের কাছে আরও আপন হয়ে ওঠে। রহমানের দলের শিল্পীদের মধ্যে জুগলবন্দির আয়োজনও ছিল, যা পরিবেশনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

রহমানের সঙ্গে মঞ্চে গান পরিবেশন করেন বিজয় প্রকাশ, জোনিতা গান্ধী, রক্ষিতা সুরেশ, এআর আমিন, আদিত্য আরকে, হির, নিতেশ আহের ও রাঘব কৌশিকসহ আরও কয়েকজন শিল্পী। বাদ্যযন্ত্রে ছিলেন রঞ্জিত বারোট, অশ্বিন শ্রীনিবাসন, এভলিন সোতো, নীলাঞ্জনা ঘোষ, রঙ্গপ্রিয়া শঙ্করনারায়ণন, হরিতা রাজ ও আলেইফ হামদানসহ একাধিক সংগীতশিল্পী।

শুরু থেকেই কনসার্টের পরিবেশ ছিল জমজমাট। শক্তিশালী সাউন্ড, বড় পরিসরের ভিজ্যুয়াল আয়োজন এবং রহমানের মঞ্চ উপস্থিতি দর্শকদের ধরে রাখে। পরিচিত গানগুলো পরিবেশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজারো দর্শক শিল্পীদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। অনেকেই মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে গানের তালে অংশ নেন। মুহূর্তেই পুরো মাঠে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।

তবে আয়োজনটি পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত ছিল না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি গানে শিল্পীদের সুর ও তালে সামান্য অসামঞ্জস্য দেখা যায়। কিছু অংশে পূর্বধারণ করা ট্র্যাক ব্যবহারের বিষয়টিও দর্শকদের নজরে পড়ে। গানের তালিকায় অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিছু গান থাকায় সেসব পরিবেশনায় দর্শকদের আগ্রহও তুলনামূলক কম ছিল। তবে রহমানের জনপ্রিয়তা ও দর্শকদের উচ্ছ্বাস এসব সীমাবদ্ধতাকে অনেকটাই ছাপিয়ে যায়।

অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে বেঙ্গালুরুর সঙ্গে নিজের পুরোনো সম্পর্কের কথাও স্মরণ করেন রহমান। কন্নড় ভাষায় দর্শকদের উদ্দেশে কথা বলেন তিনি। জানান, ১৯৮৭ সালে প্রথমবার বেঙ্গালুরুতে এসেছিলেন। পরে ১৯৯৫ সালে ‘রেঞ্জিলা’ সিনেমার সংগীত নিয়ে শহরটির মানুষের আগ্রহ তার মনে বিশেষ ছাপ ফেলেছিল।

রহমানের স্মৃতিচারণে উঠে আসে ‘রেঞ্জিলা’র সংগীত নিয়ে সেই সময়ের সংশয়ের কথাও। অনেকে মনে করেছিলেন, সিনেমাটির গান হয়তো প্রত্যাশিত সাফল্য পাবে না। কিন্তু বেঙ্গালুরুর বিভিন্ন জায়গায় ‘রেঞ্জিলা’র গান বাজতে শুনে রহমান বুঝতে পারেন, সংগীত মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। গানগুলোর প্রতি শ্রোতাদের আগ্রহ তাকে সিনেমাটির সংগীতের সম্ভাব্য সাফল্য সম্পর্কেও আশ্বস্ত করেছিল।

কনসার্টে পরিবেশিত গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘ফানা’, ‘মুকাবলা মুকাবলা’, ‘রুবারু’, ‘রোজা’, ‘মুনবে ভা’, ‘হোসানা’, ‘এ অজনবি’, ‘চিন্না চিন্না আসাই’, ‘খাজা মেরে খাজা’ ও ‘বন্দে মাতরম’। রহমানের দীর্ঘ সংগীতজীবনের বিভিন্ন সময়ের এসব গান দর্শকদের স্মৃতিতে থাকা নানা মুহূর্তকে যেন আবার ফিরিয়ে আনে। পরিচিত সুর বাজতেই অনেক দর্শক গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান।

রহমানের সংগীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন ভাষা ও ধারার শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষমতা। তামিল, হিন্দি ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষার সিনেমায় তার কাজ দীর্ঘদিন ধরে বড় শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করেছে। বেঙ্গালুরুর কনসার্টেও সেই বহুভাষিক সংগীতভাণ্ডারের প্রতিফলন দেখা যায়।

আট বছর পর বেঙ্গালুরুতে এআর রহমানের প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠান ছিল না। পুরোনো জনপ্রিয় গান, নতুন পরিবেশনা, স্থানীয় ভাষায় যোগাযোগ, দক্ষ শিল্পীদের অংশগ্রহণ এবং হাজারো দর্শকের আবেগ—সব মিলিয়ে রাতটি হয়ে ওঠে বিশেষ। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও রহমানকে ঘিরে দর্শকদের উচ্ছ্বাস শেষ পর্যন্ত পুরো আয়োজনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয় শিল্পীকে আবার মঞ্চে পাওয়ার স্মৃতিই বেঙ্গালুরুর সংগীতপ্রেমীদের কাছে রাতটির প্রধান প্রাপ্তি হয়ে রইল।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।