জামালপুরের বকশীগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার হোসেনের (৮৫) দাফন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বা গার্ড অব অনার ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে আপত্তি ওঠার পর কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার বাধার মুখে প্রশাসন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করে। বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নের মদনেরচর গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
দেলোয়ার হোসেন সাধুরপাড়া নজরুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ছিলেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। বুধবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার বিকেলে মদনেরচর গ্রামে তাঁর জানাজার সময় নির্ধারণ করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসমা উল হুসনা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে জানাজার স্থানে যাচ্ছিলেন।
তবে পথে প্রশাসনের গাড়ির গতিরোধ করেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নওশেদ আলীসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। নওশেদ আলী একই সঙ্গে উপজেলা বিএনপির মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক। তাঁরা দেলোয়ার হোসেনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেওয়ার দাবি জানান।
নওশেদ আলীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেলোয়ার হোসেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। নিয়মবহির্ভূতভাবে তাঁর নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, এই অভিযোগের কারণেই তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের বিরোধিতা করেছেন এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তবে দেলোয়ার হোসেনের পরিবার এ দাবির সঙ্গে একমত নয়। তাঁর ছেলে শামীম মিয়া বলেন, তাঁর বাবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছিলেন। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার আপত্তির কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফন করতে হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়েও ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বকশীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি আবদুল লতিফ লায়ন বলেন, দেলোয়ার হোসেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন থাকলে এতদিন তিনি কীভাবে এসব সুবিধা পেয়েছেন, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। কিন্তু ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে তীব্র আপত্তি ও বাধার মুখে পরিস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিত দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় তাৎক্ষণিকভাবে গার্ড অব অনার স্থগিত করা হয়।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসমা উল হুসনা বলেন, বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি সাধারণত একজন মুক্তিযোদ্ধার সরকারি স্বীকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ঘটনায় সেই স্বীকৃতির বৈধতা নিয়েই মূল বিরোধ দেখা দিয়েছে। একদিকে পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি দেলোয়ার হোসেনের দীর্ঘদিনের সরকারি স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধার কথা উল্লেখ করছেন, অন্যদিকে নওশেদ আলী তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে ওই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা এখনো জানানো হয়নি।
এর মধ্যেই জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত আর অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে দেলোয়ার হোসেনের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে ওঠা বিতর্ক এখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।









