,

মিয়ানমারের কারাগারে ১৫ জেলে, অনিশ্চয়তায় পরিবার

বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমার নৌবাহিনীর হাতে আটক ১৫ বাংলাদেশি জেলে প্রায় ছয় মাস ধরে দেশটির কারাগারে বন্দী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আটজন। জলসীমা লঙ্ঘন করে মিয়ানমারে প্রবেশের অভিযোগে তাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষগুলো বাড়ির বাইরে থাকায় রামগতি, কমলনগর, নোয়াখালী ও ভোলার বেশ কয়েকটি পরিবার এখন চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে।

গত ২৫ মার্চ সেন্টমার্টিনের কাছাকাছি জলসীমা থেকে ‘এফবি মা-বাবার দোয়া’ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলারসহ ওই জেলেদের আটক করে মিয়ানমার নৌবাহিনী। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের অভিযোগ আনা হয় এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই ঘটনায় আটক হওয়া ১৫ বছর বয়সী মো. তাহমীদ অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় সম্প্রতি মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরেছে।

রামগতি উপজেলার চর গজারিয়া এলাকার বাসিন্দা তাহমীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের কারাগারে থাকা বাংলাদেশি জেলেদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। তাঁদের পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেছে সে। দেশে ফিরে আসার পর তাহমীদের বর্ণনায় বন্দীদের পরিবারগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

একই ট্রলার থেকে আটক জেলেদের মধ্যে রামগতির আটজন ছাড়াও কমলনগর, নোয়াখালীর সুবর্ণচর, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, ভোলার দৌলতখান এবং কক্সবাজারের মহেশখালীর বাসিন্দা রয়েছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই জীবিকার জন্য মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিতওয়েতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের প্রধান আবদুল্লাহ আল রাজি জানিয়েছেন, জলসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে রামগতির আটজনসহ প্রায় ১৮০ বাংলাদেশি মিয়ানমারের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী রয়েছেন। তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ক্ষমা ও মুক্তির আবেদন জানানো হয়েছে।

বন্দী জেলেদের পরিবারগুলোর আর্থিক পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। তাঁদের অনেকেই নদীভাঙনের কারণে ভিটেমাটি হারিয়েছেন। কারও বসতভিটা নেই, কেউ আবার নদীর পাড়ে অস্থায়ী ঘরে বসবাস করছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দীর্ঘদিন কারাগারে থাকায় খাবার, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

চর পোড়াগাছা ইউনিয়নের ভূলুয়া নদীর পাড়ে বসবাস করেন জেলে মো. নিরবের স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। স্বামী আটক হওয়ার পর তিনি শাশুড়ি, দুই ননদ ও দুই মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের নিজস্ব কোনো ভিটামাটি নেই। নদীর পাড়ে ছোট একটি ঘর তুলে কোনোভাবে বসবাস করছেন তাঁরা। সুমাইয়া জানান, নিরবই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর অনুপস্থিতিতে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ জোগাড় করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একই ধরনের সংকটে আছেন চর আলেকজান্ডার ইউনিয়নের সোনালী গ্রামের ফরহাদ হোসেনের পরিবার। ফরহাদের মা ফরিদা বেগম জানান, নদীভাঙনে তাঁদের ভিটেমাটি হারিয়ে গেছে। ফরহাদের বাবা দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে বাড়িতে থাকেন। চার সদস্যের পরিবারে ফরহাদই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ছেলে বিদেশি কারাগারে থাকায় পরিবারের সদস্যদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

বন্দী জেলেদের স্বজনেরা জানান, তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন ও কর্মসূচি পালন করেছেন তাঁরা। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনেও মানববন্ধন করেছেন পরিবারের সদস্যরা। পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁদের স্বজনদের দেশে ফেরানোর বিষয়ে এখনো কার্যকর সমাধান মেলেনি।

এদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। রামগতি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দীন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান জানিয়েছেন, বন্দী জেলেদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে স্বজনদের অনুপস্থিতিতে পরিবারগুলো যেমন অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে, তেমনি বন্দী জেলেদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। তাই দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁদের মুক্তি ও দেশে প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনেরা।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।