ভোলা গ্রাম থেকে অভিজাত গুলশান

ঢাকার অভিজাত আবাসিক ও কূটনৈতিক এলাকাগুলোর মধ্যে গুলশান আজ এক অনন্য নাম। আধুনিক বহুতল ভবন, বিদেশি দূতাবাস, কর্পোরেট অফিস, বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ ও শপিং মল—সব মিলিয়ে এটি যেন ঢাকার বুকে এক আধুনিক আন্তর্জাতিক নগরীর প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এই চকচকে গুলশানের ইতিহাস এক সময়ের নীরব, সবুজে ঘেরা এক গ্রামীণ জনপদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, যার নাম ছিল “ভোলা গ্রাম”।

কৃষিভিত্তিক শান্ত গ্রাম

বর্তমান গুলশান একসময় ছিল কৃষিজমি, খালবিল ও গাছপালায় ঘেরা এক নিস্তব্ধ এলাকা। স্থানীয়ভাবে এটি “ভোলা গ্রাম” নামে পরিচিত ছিল। ধারণা করা হয়, ভোলা জেলা থেকে আসা কৃষক পরিবারগুলো এখানে বসতি গড়ে কৃষিকাজ শুরু করে। ধান, সবজি ও ফলের চাষই ছিল এখানকার প্রধান জীবিকা। জনবসতি ছিল খুবই সীমিত, আর জীবনযাত্রা ছিল একেবারে সাধারণ গ্রামীণ রীতির।

রাত হলে শোনা যেত শেয়ালের ডাক, চারপাশে ছিল ঘন ঝোপঝাড় ও নির্জন পথঘাট। লোককথা অনুযায়ী, ষাটের দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত এই এলাকায় বন্য প্রাণীর উপস্থিতিও ছিল। পুরো অঞ্চলটি ছিল ঢাকার শহুরে জীবনের বাইরে এক শান্ত গ্রামীণ জগৎ।

মুঘল ও ব্রিটিশ আমলের প্রেক্ষাপট

মুঘল আমলে ঢাকা শহরের আশপাশ নদী, খাল ও কৃষিজমিতে ভরপুর ছিল। গুলশান অঞ্চল তখন মূলত নদীপথনির্ভর কৃষি ও ছোট গ্রামীণ বসতির অংশ ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকায় ধীরে ধীরে নগরায়ণ শুরু হলেও এই এলাকা দীর্ঘ সময় কৃষিনির্ভরই থেকে যায়। জমিদারদের হাতে কিছু জমি গেলেও সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ চাষাবাদ চালিয়ে যান। “ভোলা গ্রাম” নামটি তখনও স্থানীয়ভাবে বহুল প্রচলিত ছিল।

পরিকল্পিত গুলশানের জন্ম (পাকিস্তান আমল)

১৯৪৭ সালের পর ঢাকার জনসংখ্যা ও নগরায়ণ দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৬০-এর দশকে তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (DIT) পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। এই সময় গুলশান এলাকা নির্বাচন করা হয় একটি আধুনিক মডেল টাউন হিসেবে।

১৯৬১ সালের দিকে সরকারি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই গ্রামাঞ্চল অধিগ্রহণ করা হয় এবং ধীরে ধীরে শুরু হয় অবকাঠামো নির্মাণ। সেই সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বের উদ্যোগে এলাকাটির নতুন নামকরণ করা হয় “গুলশান”, যার অর্থ “ফুলের বাগান”। নামটি অনুপ্রাণিত হয়েছিল করাচির একটি অভিজাত এলাকার নাম থেকে।

অবকাঠামো ও নগরায়ণের শুরু

শুরুর দিকে গুলশানে ছিল না কোনো আধুনিক সুবিধা। রাস্তা, সেতু, বাজার, থানা কিংবা স্কুল—প্রায় কিছুই ছিল না। মানুষকে পর্যন্ত মহাখালী থেকে হেঁটে এখানে আসতে হতো। তবে ধীরে ধীরে পরিকল্পিত উন্নয়ন শুরু হয়। লেক খনন করে রাস্তা নির্মাণ, সেতু তৈরি, বাজার স্থাপন এবং সড়কবাতির ব্যবস্থা করা হয়।

প্রাথমিকভাবে কিছু স্কুল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া বড় কোনো অবকাঠামো ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধনী ও অভিজাত শ্রেণির মানুষ এখানে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ শুরু করে। তারা ছোট কিন্তু সুন্দর বাড়ি, ফুলের বাগান ও সামাজিক আড্ডার জায়গা তৈরি করে এলাকাটিকে ধীরে ধীরে অভিজাত রূপ দেয়।

প্রশাসনিক উন্নয়ন ও আধুনিক গুলশান

১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর গুলশান এলাকাকে কেন্দ্র করে একটি থানার কাঠামো গড়ে ওঠে। পরে ১৯৮০-এর দশকে এটি ঢাকা পৌরসভার অংশে পরিণত হয়। এরপর দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে নগরায়ণ। ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র।

বর্তমান গুলশান

আজ গুলশান শুধুমাত্র একটি আবাসিক এলাকা নয়; এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও কর্পোরেট কেন্দ্র। এখানে রয়েছে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, আন্তর্জাতিক সংস্থা, ব্যাংক, বহুজাতিক কোম্পানি, বিলাসবহুল হোটেল ও রেস্তোরাঁ। আধুনিক জীবনযাত্রার প্রতিটি উপাদান এখানে বিদ্যমান।

তবুও এই আধুনিকতার আড়ালে রয়ে গেছে এক সময়ের “ভোলা গ্রাম”-এর ইতিহাস—যেখানে ছিল কৃষিজীবী মানুষের সরল জীবন, সবুজ মাঠ আর নির্জন গ্রামীণ পরিবেশ।

গুলশানের ইতিহাস মূলত এক রূপান্তরের গল্প—গ্রামীণ কৃষিজীবন থেকে শুরু করে পরিকল্পিত আধুনিক নগরায়ণ পর্যন্ত। মুঘল যুগের প্রাকৃতিক পরিবেশ, ব্রিটিশ আমলের কৃষি ঐতিহ্য, পাকিস্তান আমলের পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের আধুনিক নগরায়ণ—সব মিলিয়ে গুলশান আজ এক বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক বিবর্তনের প্রতীক।

চলবে…….

লেখকঃ এ বি এন জাকিরুল হক টিটন
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ জি-লাইভ ২৪