দেশের ব্যাংকিং খাতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস (Incentive Bonus) প্রদানের বিদ্যমান নীতিমালায় কিছুটা শিথিলতা এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে কোনো ব্যাংক বছরের নির্ধারিত সকল আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জন করতে না পারলেও, বিশেষ কোনো অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের কর্মীদের বোনাস প্রদান করতে পারবে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি-২) থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত)-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারিকৃত এই নির্দেশনাটি দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং এটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
Table of Contents
নতুন নির্দেশনার মূল বৈশিষ্ট্য ও শিথিলতার স্বরূপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক যদি একটি নির্দিষ্ট পঞ্জিকা বছরে তাদের নির্ধারিত সকল ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা বা শর্ত পুরোপুরি পূরণ করতে সক্ষম না-ও হয়, তবুও সেই বছরে ব্যাংকের যদি বিশেষ কোনো সাফল্য বা উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকে, তবে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে কর্মীদের বোনাস দেওয়া যাবে।
এই বিশেষ বোনাসের ক্ষেত্রে প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
পরিমাণ: বিশেষ অর্জনের জন্য প্রদত্ত এই বোনাসের পরিমাণ হবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সর্বোচ্চ এক মাসের মূল বেতনের (Basic Salary) সমপরিমাণ।
বিবেচ্য বিষয়: ব্যাংকের কোনো বিশেষ প্রকল্পে সাফল্য, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ কিংবা সংকটকালীন বিশেষ অবদানের মতো বিষয়গুলোকে ‘উল্লেখযোগ্য সাফল্য’ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে।
উদ্দেশ্য: এর মাধ্যমে মূলত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ব্যাংক কর্মীদের কাজের প্রতি উৎসাহ বৃদ্ধি এবং বিশেষ কৃতিত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হবে।
বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক কঠোর শর্তসমূহ
উৎসাহ বোনাস প্রদানের নীতিমালায় কিছুটা নমনীয়তা আনলেও, আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থে বেশ কিছু অনমনীয় শর্ত বহাল রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ অর্জনের ভিত্তিতে বোনাস অনুমোদন করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অবশ্যই নিচের ৪টি শর্ত পরিপালন করতে হবে:
১. পরিচালন মুনাফা অর্জন: বোনাস প্রদানকারী ব্যাংককে সংশ্লিষ্ট বছরে অবশ্যই প্রকৃত পরিচালন মুনাফা (Operating Profit) করতে হবে। কোনোভাবেই লোকসানি ব্যাংক এই সুবিধার আওতায় আসবে না। ২. মূলধনের স্থিতিশীলতা: ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি আগের বছরের তুলনায় কোনোভাবেই হ্রাস পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ, মূলধন পর্যাপ্ততা নিশ্চিত না করে কর্মীদের বোনাস দেওয়া যাবে না। ৩. প্রভিশন সংরক্ষণে কঠোরতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, নতুন করে কোনো সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণে বিলম্ব করার সুবিধা (Provision Deferral) চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করা যাবে না। অর্থাৎ, ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেই মুনাফা গণনা করতে হবে। ৪. পর্ষদ অনুমোদন: সংশ্লিষ্ট বছরের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের যৌক্তিকতা বিচার করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে এই বোনাস প্রদানের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করতে হবে।
নীতিমালার প্রেক্ষাপট ও আইনি ভিত্তি
বাংলাদেশ ব্যাংক এই নির্দেশনাটি জারি করেছে মূলত ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত)’-এর ৪৫ ধারার অধীনে। এই ধারাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জনস্বার্থ রক্ষা অথবা ব্যাংকিং নীতির স্বার্থে যেকোনো ব্যাংকিং কোম্পানির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রদান করে।
উল্লিখিত নতুন নিয়মটি কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে আগের সার্কুলারগুলোতে বর্ণিত অন্যান্য সকল সাধারণ শর্ত ও বিধিনিষেধ অপরিবর্তিত থাকবে। এর আগে ২০২২ ও ২০২৪ সালে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল ব্যাংকিং খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন। বর্তমান নির্দেশনাটি সেই কঠোর অবস্থানের মধ্যে সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে কিছুটা নমনীয়তা নিয়ে এসেছে।
ব্যাংকিং খাতে নতুন নির্দেশনার সম্ভাব্য প্রভাব ও গুরুত্ব
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্দেশনার ফলে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে:
মেধা ধরে রাখা: স্থিতিশীল ব্যাংকগুলো তাদের কর্মীদের বিশেষ কৃতিত্বের জন্য পুরস্কৃত করতে পারবে, যা মেধাবী কর্মকর্তাদের অন্য খাতে চলে যাওয়া রোধ করবে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত: প্রভিশন ডেফারাল সুবিধার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় কোনো ব্যাংক ঋণের ঝুঁকি লুকিয়ে কৃত্রিম মুনাফা দেখিয়ে বোনাস দেওয়ার সুযোগ পাবে না। এতে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল করার প্রবণতা কমবে।
মনোবল বৃদ্ধি: বৈশ্বিক বা জাতীয় অর্থনীতির চাপে ব্যাংকগুলো যখন বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হিমশিম খায়, তখন ছোট ছোট বিশেষ অর্জনের স্বীকৃতি কর্মীদের মানসিক শক্তি যোগাবে।
পরিশেষে, এই নির্দেশনাটি মঙ্গলবার থেকেই কার্যকর হওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন থেকে তাদের বার্ষিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন নিয়মে উৎসাহ বোনাস বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। এটি মূলত ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি এবং কৃতিত্ব-ভিত্তিক কাজের সংস্কৃতিকে আরও সুদৃঢ় করবে, যা দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
