জাতীয় গ্রিডে জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক ঘাটতির কারণে দেশে এক নজিরবিহীন শিল্প সংকট তৈরি হয়েছে। টানা তিন সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে তৈরি পোশাক, কেমিক্যাল, স্টিল, সিরামিক, পেপার ও সিমেন্টসহ দেশের সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থা। গ্যাসের চাপ কাঙ্ক্ষিত মাত্রার নিচে নেমে যাওয়ায় এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও হবিগঞ্জের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোর অধিকাংশ ভারী কলকারখানায় উৎপাদন প্রায় শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। এর ফলে যেমন রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের পতনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মারাত্মক ঘাটতি তৈরির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)-এর প্রায় সবকটি কারখানা গ্যাস না পেয়ে বন্ধ রাখতে হয়েছে। আটা, ময়দা, সুজি, ভোজ্যতেল, চিনি ও এলপিজির মতো খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে শীর্ষ সারিতে থাকা এই শিল্পগ্রুপটির ৫৭টি কারখানা অচল হয়ে পড়ায় সারাদেশে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নূন্যতম গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় তাদের প্রায় ৬৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগের পরও এখনো কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি।
একই ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে টি কে গ্রুপে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গজারিয়ায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির ভোজ্যতেল, কেমিক্যাল ও সিমেন্ট কারখানাগুলোতে কয়েক দিন ধরে কোনো উৎপাদন নেই। সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে উদ্যোক্তারা বলছেন, সার আমদানির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ চালু রেখে শত শত রপ্তানিমুখী ও নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী কারখানায় গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ রাখা কোনো যুক্তিসঙ্গত কৌশল হতে পারে না।
শিল্পাঞ্চলগুলোর সরেজমিন চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক:
হবিগঞ্জ শিল্পাঞ্চল: দেশের অন্যতম প্রধান এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাবে অবস্থিত প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার, যমুনা ও সায়হামের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের ১৭১টি কারখানায় তিতাস ও জালালাবাদ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখায় উৎপাদন সম্পূর্ণ স্তব্ধ। অলস সময় পার করছেন দেড় লাখের বেশি শ্রমিক। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় পণ্য উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চল: গাজীপুর শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৩,৫০০টি কারখানার মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাবে অন্তত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ (প্রায় ৫২৫টি) কারখানা পুরোপুরি বন্ধ। বাকি কারখানাগুলো অর্ধেকেরও কম সক্ষমতায় চলছে।
তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত: বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ সূত্রে জানা গেছে, স্পিনিং ও ডাইং মিলগুলোতে চিলার বন্ধ থাকায় পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে এক একটি বৃহৎ পোশাক গ্রুপ প্রতিদিন ৬৫ হাজার লিটার ডিজেল পুড়ছে, যার দৈনিক ব্যয় প্রায় ৭০ লাখ টাকা। এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি বহন করে কারখানা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
একনজরে দেশের সার্বিক শিল্প সংকটের পরিসংখ্যানগত চিত্র তুলে ধরা হলো:
| শিল্পপ্রতিষ্ঠান / অঞ্চল | বর্তমান উৎপাদন অবস্থা | সরাসরি প্রভাব ও ক্ষতির পরিমাণ |
| মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ | ৫৭টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ | সারাদেশে নিত্যপণ্যের মোট সরবরাহের অর্ধেকেরও বেশি বাধার মুখে। |
| টি কে গ্রুপ | তেল, সিমেন্ট ও কেমিক্যাল কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ | স্থানীয় বাজারে কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় কেমিক্যালের তীব্র সংকট। |
| আরএফএল গ্রুপ | উৎপাদন ৫০%-এর নিচে নেমে এসেছে | নন-ফুড সামগ্রী (প্লাস্টিক, পাইপ, ইলেকট্রনিক্স)-এ দ্বিগুণ উৎপাদন খরচ। |
| হবিগঞ্জ বিসিক ও শিল্পাঞ্চল | ১৭১টি কারখানার উৎপাদন স্থগিত | ১,৫০,০০০-এর বেশি শ্রমিক কাজ হারিয়ে অলস সময় পার করছেন। |
| গাজীপুর অঞ্চল | ৫২৫টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ | ৪০% উৎপাদন হ্রাস; আন্তর্জাতিক বায়ারদের ক্রয়াদেশ বাতিলের ঝুঁকি। |
| গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাত | গড়ে ৩০% থেকে ৫০% সক্ষমতায় চালিত | প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ডিজেল অপচয়; বিদেশি বায়ারে ডেডলাইন মিসের শঙ্কা। |
| ফতুল্লা রি-রোলিং মিলস | স্টিল মিলগুলো ১ মাস ধরে বন্ধ | আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণ খাতের রড ও স্টিল সরবরাহ বিঘ্নিত। |
| জামালপুর অঞ্চল | সিএনজি স্টেশনে গ্যাস না পেয়ে মহাসড়ক অবরোধ | জামালপুর-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক সড়কে দীর্ঘ যানজট ও যাত্রীদের ভোগান্তি। |
| ব্রাহ্মণবাড়িয়া (সরাইল) | মহাসড়কে পরিবহনের বিক্ষোভ | ঢাকা-সিলেট রুটে ঘণ্টাভিত্তিক যানজট ও পণ্য পরিবহন স্থবির। |
| জাতীয় গ্রিডে গ্যাস বরাদ্দ | শিল্পে সরবরাহ ৫৫-৬০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে | স্বাভাবিক সময়ের (১৬০-১৬৫ কোটি ঘনফুট) তুলনায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৭০%। |
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জনরোষ ও বাসাবাড়ির চাপ সামাল দিতে শিল্প খাতের গ্যাসের বরাদ্দ কমিয়ে বিদ্যুতে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে শিল্পে স্বাভাবিক সময় যেখানে ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হতো, তা এখন নেমে এসেছে মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুটে।
জ্বালানি সংকটের এই উত্তাপ এখন রাজপথেও গড়িয়েছে। সিএনজি স্টেশনে চাপ না থাকায় ও পাইপলাইনে গ্যাস না পাওয়ায় জামালপুর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে যানবাহন চালকরা মহাসড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এতে স্তব্ধ হয়ে পড়ে যান চলাচল।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প মালিকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কারখানা বন্ধ হয়ে তৈরি হবে ব্যাপক শ্রমিক অসন্তোষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুনাম। সংকট উত্তরণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্প খাতে গ্যাস বরাদ্দ পুনঃবন্টন করা এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর জোর দাবি জানানো হচ্ছে।









