খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই জুলাই ২০২৬, ৫:৪০ পিএম

বিশ্বকাপ ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে তখন একদিকে বিদায়ের বিষাদ, অন্যদিকে লড়াকু ফুটবল খেলে মাথা উঁচু করে মাঠ ছাড়ার তৃপ্তি। বিশ্বকাপের রাউন্ড অব বত্রিশের অত্যন্ত উত্তেজনাকর এক ম্যাচে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে কঙ্গো প্রজাতন্ত্র। তবে মাঠের সেই হার-জিতের হিসাবকে ছাপিয়ে এক অভূতপূর্ব ও হৃদয়বিদারক মুহূর্ত তৈরি হলো ম্যাচ-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে। যখন পুরো বিশ্ব কঙ্গোর দুর্দান্ত ফুটবল কৌশলের প্রশংসা করতে ব্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদটি পেলেন দলটির ফরাসি প্রধান কোচ সেবাস্তিয়ান দেশাব্রে। লাইভ সংবাদ সম্মেলন চলাকালেই তিনি জানতে পারেন, তাঁর প্রিয় বাবা আর ইহজগতে নেই।
গত বুধবার ম্যাচ শেষ হওয়ার পর কঙ্গো দলের প্রতিনিধি হিসেবে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন দেশাব্রে। ফুটবলারদের পারফরম্যান্স এবং ম্যাচ নিয়ে নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ দিচ্ছিলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনের একেবারে শেষ দিকে যখন সমাপনী বক্তব্য আসছিল, ঠিক তখনই পুরো কক্ষ স্তব্ধ করে দেন কঙ্গো দলের মিডিয়া কর্মকর্তা। তিনি আচমকা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ফরাসি ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘সবাইকে ধন্যবাদ। তবে আমরা এই মুহূর্তে অত্যন্ত দুঃখের সাথে একটি বিষয় জানাতে চাই, আমাদের কোচ আজ তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন।’ এরপর অশ্রুসিক্ত চোখে কোচের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘পুরো দলের পক্ষ থেকে আমরা কোচের প্রতি আমাদের গভীরতম আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।’
হঠাৎ লাইভ ক্যামেরার সামনে পাওয়া এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক খবরে পাথর হয়ে যান সেবাস্তিয়ান দেশাব্রে। সংবাদ সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যেও এক মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। নিজেকে সামলে নিয়ে দেশাব্রে অত্যন্ত নিচু স্বরে কেবল একটি ‘ধন্যবাদ’ শব্দ উচ্চারণ করেন। এরপর ভারী হৃদয় নিয়ে দ্রুত সংবাদ সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করেন তিনি।
গত চার বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কঙ্গো জাতীয় ফুটবল দলের কোচের দায়িত্ব পালন করছেন এই ফরাসি ফুটবল মেন্টর। তাঁর জাদুকরী ছোঁয়া ও আধুনিক ফুটবল দর্শনের ওপর ভর করেই দীর্ঘ ৫০ বছর পর, অর্থাৎ ১৯৭৪ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে মধ্য আফ্রিকার এই দেশ। কঙ্গোকে কেবল মূল পর্বেই তোলেননি দেশাব্রে, টুর্নামেন্টের অন্যতম কঠিন ‘জে’ গ্রুপ থেকে লুইজ দিয়াজের কলম্বিয়া ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালের মতো ফুটবল পরাশক্তিদের বিপক্ষে বুক চিতিয়ে লড়াই করে দলকে নকআউট পর্বেও নিয়ে এসেছিলেন তিনি।
ইউরোপের অন্যতম সেরা দল ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও কঙ্গোর শুরুটা হয়েছিল রূপকথার মতো। ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই স্ট্রাইকার ব্রায়ান সিপেঙ্গার দুর্দান্ত এক নিখুঁত গোলে এগিয়ে যায় কঙ্গো। এই লিড নিয়ে প্রথমার্ধের দীর্ঘ সময় হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহামদের রক্ষণভাগকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দেয় আফ্রিকান দলটি। তবে অভিজ্ঞতার দিক থেকে এগিয়ে থাকা ইংল্যান্ড দ্বিতীয়ার্ধে খোলস ছেড়ে বের হয়। ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইনের অতিমানবীয় এক জোড়া গোলে শেষ পর্যন্ত ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়ে কষ্টার্জিত জয় নিশ্চিত করে থ্রি-লায়ন্সরা। কঙ্গোকে বিদায় নিতে হলেও তাদের লড়াকু মানসিকতা পুরো ফুটবল বিশ্বের মন জয় করে নেয়। কিন্তু ম্যাচ শেষের সেই গৌরবময় ক্ষণটি কঙ্গো কোচের জন্য আজীবনের এক পরম বেদনার উপাখ্যান হয়ে রইল।
মন্তব্য