খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুলাই ২০২৬, ৪:৪৮ পিএম

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল থাকা অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে তিনি ওয়াশিংটন ডিসির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বলে ইসরায়েল সরকারের আরবি ভাষার সরকারি এক্স অ্যাকাউন্টে জানানো হয়েছে। সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন গাজা যুদ্ধ, বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।
ওয়াশিংটনে অবস্থানকালে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি এবং দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কারণে এই বৈঠককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর এটি সপ্তম বৈঠক হতে যাচ্ছে। ফলে ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদে অন্য যেকোনো বিশ্বনেতার তুলনায় নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর বৈঠকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হতে চলেছে। দুই নেতার মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা থাকলেও তাঁদের বৈঠকগুলো বরাবরই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নের মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।
এবারের সফরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় অবশ্য নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজা যুদ্ধের সময় সংঘটিত কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। আদালতের অভিযোগের মধ্যে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের বিষয়ও রয়েছে। তবে ইসরায়েল এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে দেশটির পক্ষ থেকে আইসিসির এখতিয়ার ও সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আইসিসির পরোয়ানা কার্যকর করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্কিত ইস্যু। আদালতের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে পরোয়ানা বাস্তবায়ন নিয়ে নির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র নয়। ফলে মার্কিন ভূখণ্ডে নেতানিয়াহুর সফরের ক্ষেত্রে পরোয়ানা কার্যকরের প্রশ্নটি অন্য সদস্য রাষ্ট্রে তাঁর সফরের তুলনায় ভিন্ন আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে পড়ে। এই কারণেই ওয়াশিংটনে তাঁর উপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সফরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য সফরটির রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে গাজায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও মানবিক সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে উদ্বেগ রয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে সমালোচনা ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বৈঠকে গাজা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা, ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতার মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। গাজা পরিস্থিতির পাশাপাশি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য নীতিও আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বৈঠকের পূর্ণাঙ্গ ও নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি কিংবা সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
নেতানিয়াহুর এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন গাজা সংঘাতকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে মতবিরোধ তীব্র। একদিকে ইসরায়েল তার নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ ক্রমেই জোরালো হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর বৈঠক কেবল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে নয়, বরং গাজা যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। আইসিসির পরোয়ানা, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা—সবকিছু মিলিয়ে এবারের ওয়াশিংটন সফরটি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য