,

‘আমরাই চিরস্থায়ী ভুক্তভোগী’: ছফামনে ভিকটিমহুড কার্ড ও ক্ষোভের রাজনীতি । ছফামন পর্ব ৪

রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের একটি মৌলিক বিভাজনরেখা হলো: ‘ঐতিহাসিক বঞ্চনা’ (Historical Deprivation) এবং ‘স্থায়ী ভিকটিমহুড’ (Permanent Victimhood Identity)-এর মধ্যকার পার্থক্য। কোনো জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট পর্বে অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা, যা বস্তুনিষ্ঠ সাম্যভিত্তিক রাজনৈতিক লড়াই, ভূমি সংস্কার, শিক্ষার বিস্তার ও নাগরিক অধিকার অর্জনের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট মেয়াদের ঐতিহাসিক বঞ্চনাকে যখন কোনো চিন্তক একটি জনগোষ্ঠীর চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক পরিচয় বা অস্তিত্বের একমাত্র সংজ্ঞায় রূপান্তর করেন, তখন তা আর প্রগতিশীল রাজনীতি থাকে না; তা পরিণত হয় উগ্র পরিচয়বাদ ও ক্ষোভের রাজনীতিতে।

আহমদ সফা তাঁর প্রবন্ধাবলী ও চিন্তাকাঠামোতে এই বিপজ্জনক কাজটিই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পাদন করেছেন। তিনি ১৯ শতকের বাঙালি মুসলিম সমাজের ঐতিহাসিক অনগ্রসরতাকে প্রগতিশীল সামাজিক সাম্যের দিকে পরিচালিত না করে তাকে একটি “চিরস্থায়ী ভুক্তভোগী মানস”-এ উন্নীত করেছেন। চলুন দেখে নেই – কীভাবে ছফামন গঠনমূলক নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ রুদ্ধ করে ক্ষোভ, ঈর্ষা ও সামাজিক প্রতিশোধপ্রবণতাকে রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি বানিয়েছে।

১. ‘ঐতিহাসিক বঞ্চনা’ বনাম ‘স্থায়ী ভিকটিমহুড’: ছফীয় কৌশলের তাত্ত্বিক জাদুটোনা

১৯ শতকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ নীতির ফলে (যেমন: ১৭৯৩-এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা ১৮৩৭ সালে ফারসির স্থানে প্রমিত বাংলার দাপ্তরিক স্বীকৃতি) মুসলিম উচ্চবিত্ত ও প্রজা সমাজের একটি অংশ সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একজন দায়িত্বশীল ও প্রগতিশীল চিন্তকের কাজ ছিল এই বঞ্চনাকে শ্রেণিগত ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে সমাধান খোঁজা—যেমনটি পরবর্তীতে বামপন্থী ও অসাম্প্রদায়িক অকৃষক আন্দোলনকারীরা করেছিলেন।

কিন্তু সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে এই বঞ্চনাকে কোনো সমাধানযোগ্য সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখেননি; তিনি একে রূপ দিয়েছেন এক অকাট্য মেটাফিজিক্যাল ট্র্যাজেডিতে।

সফা লিখছেন:
“বাঙালি মুসলমানের সমস্ত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা গড়ে উঠেছে একটি দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনাবোধের মধ্য দিয়ে। …সে মনে করেছে এই বঙ্গভূমিতে তার কোনো স্বাতন্ত্র্য নেই, তার অধিকার ও অর্জন সবকিছুই অন্য একটি সম্প্রদায় দ্বারা আত্মসাৎ করা হয়েছে।”
সফার এই যুক্তিধারাটি খেয়াল করা জরুরি:
  • সক্রিয়তা (Agency) কাড়িয়া নেওয়া: সফার ভাষ্যে বাঙালি মুসলিম কেবলই এক “অসহায় শিকার” (Passive Victim), যার নিজস্ব কোনো সামাজিক ভুল, অভ্যন্তরীণ গোঁড়ামি বা আশরাফ শোষকদের চক্রান্ত ছিল না। তার যা কিছু দুর্দশা, তা কেবল অন্য সম্প্রদায়ের শোষণের কারণে।
  • বঞ্চনাকে স্থায়ী রূপ দান: বঞ্চনাকে আন্দোলনের মাধ্যমে অতিক্রম করার বদলে সফা একে একটি আত্মপরিচয়ের প্রতীক বানিয়ে দিয়েছেন। ফলে ‘ভুক্তভোগী হওয়া’টাই যেন বাঙালি মুসলিমের একমাত্র ঐতিহাসিক পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।

২. ছফামনে ‘রেসোঁতিমা’ (Ressentiment) ও ঈর্ষার সমাজমনস্তত্ত্ব

জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিশ নিচে ও সমাজবিজ্ঞানী মাক্স শেলারের তত্ত্বে ‘রেসোঁতিমা’ (Ressentiment) ধারণার উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি হলো এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যেখানে কোনো নিগৃহীত বা পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী নিজেদের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতাকে কাঠামোগত সাধনার মাধ্যমে কাটিয়ে ওঠার বদলে, পরম সামাজিক ঈর্ষা, ক্ষোভ ও প্রতিশোধপ্রবণতাকে তাদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি বানিয়ে নেয়।

ছফামন হলো এই ‘রেসোঁতিমা’র সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক কারখানায় রূপ নেওয়া উদাহরণ। সফা বাঙালি মুসলিমকে আত্মসংস্কার, বিজ্ঞানচর্চা, নারীমুক্তি বা আধুনিক চিন্তায় বলীয়ান হওয়ার আহ্বান জানাননি; তিনি তাদের মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে উসকে দিয়েছেন।

সফা লিখছেন:
“বাঙালি মুসলমানের যে দৈন্য, যে কূপমণ্ডূকতা—তা তার নিজস্ব সৃষ্ট নয়; তা হলো উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজের অবিরাম অবজ্ঞা ও বর্জনের অনিবার্য প্রতিক্রিয়া।”
এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে সফা দুটি ক্ষতিকর কাজটি করেছেন:

১. তিনি বাঙালি মুসলিমকে শিখিয়েছেন যে নিজের ভেতরের ধর্মান্ধতা বা অবক্ষয় নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ এর দায় ‘অন্যদের’।

২. তিনি আত্মোন্নয়নের বদলে বাহ্যিক প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণাকে প্রগতিশীলতার পোশাক পরিয়ে দিয়েছেন।

[ছফীয় 'ভিকটিমহুড' থেকে উগ্র ফ্যাসিবাদের রূপান্তর চক্র]

১. ঐতিহাসিক বঞ্চনা (১৯ শতকের নির্দিষ্ট সামাজিক বাস্তবতাকে চিরন্তন রূপ দান)
                    ↓
২. আত্মসংস্কারের পথ বন্ধকরণ (মোল্লাতন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ অপরাধের সমস্ত দায় ঢেকে দেওয়া)
                    ↓
৩. সামাজিক 'রেসোঁতিমা' তৈরি (অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি চিরস্থায়ী ক্ষোভ ও ঈর্ষা লালন)
                    ↓
৪. সাম্যের বদলে প্রতিশোধের রাজনীতি (নাগরিক অধিকারের বদলে গরিষ্ঠতাবাদী আধিপত্যের দাবি)
                    ↓
৫. উগ্র ডানপন্থা ও সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্বাসন

৩. নাগরিক অধিকার ও সাম্যের রাজনীতির বিনাশ: অধিকার বনাম প্রতিশোধ

গঠনমূলক আধুনিক রাজনীতি পরিচালিত হয় নাগরিক অধিকার, সাম্য ও সেক্যুলার আইনের ওপর ভিত্তি করে। সেখানে প্রতিটি নাগরিক, তা সে সংখ্যাগরিষ্ঠ হোক বা সংখ্যালঘু, রাষ্ট্রে সমান অধিকার দাবি করে। কিন্তু ‘ভিকটিমহুড কার্ড’-এর ওপর দাঁড়িয়ে যে রাজনীতি গড়ে ওঠে, তার মূল লক্ষ্য সাম্য নয়; তার মূল লক্ষ্য হলো প্রতিশোধ (Retribution)।

সফা তাঁর রাজনৈতিক নিবন্ধগুলোতে বহুবার সুশীল সমাজ ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে আক্রমণ করেছেন, কারণ সেই রাজনীতি সাম্য ও নাগরিক পরিচয়ের কথা বলে। সফার দর্শনে “আমরা তো ভুক্তভোগী” বয়ানের আড়ালে এই বার্তা সুপ্রচ্ছন্ন ছিল যে: যেহেতু অতীতে বাঙালি মুসলিমরা বঞ্চিত হয়েছে, তাই এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও সংস্কৃতিতে তাদের একক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করাই হলো প্রকৃত ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার।

এর ফলে:

  • নাগরিক পরিচয় ধ্বংস হয়েছে: মানুষ ‘রাষ্ট্রের সমান নাগরিক’ হওয়ার বদলে কেবল ‘ঐতিহাসিকভাবে নির্যাতিত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য’ হিসেবে নিজেকে দেখতে শুরু করেছে।
  • সংখ্যালঘুদের প্রতি সহিংসতার বৈধতা: গরিষ্ঠতাবাদী মানসিকতা যখন নিজেকে চিরস্থায়ী ‘ভুক্তভোগী’ মনে করে, তখন সে দেশের প্রকৃত সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নিজের নিপীড়নকে ‘ঐতিহাসিক প্রতিশোধ’ বা ‘প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া’ বলে জায়েজ করতে চায়।

৪. ডানপন্থী ও সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের প্রধান জ্বালানি

পৃথিবীর ইতিহাসের প্রতিটি প্রতিক্রিয়াশীল ও ফ্যাসিবাদের মূল অস্ত্র হলো এই “ভিকটিমহুড ন্যারেটিভ”। হিটলার যেমন জার্মানদের বুঝিয়েছিলেন যে তারা বিশ্বযুদ্ধে ‘ইহুদি ও মিত্রশক্তির চক্রান্তের ভুক্তভোগী’, কিংবা ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা যেমন দাবি করে তারা ‘হাজার বছরের মুসলিম শাসনের ভুক্তভোগী’—ঠিক একইভাবে বাংলাদেশে উগ্র ডানপন্থী ও মৌলবাদী রাজনীতির প্রধান জ্বালানি হলো সফার তৈরি করা এই “বাঙালি মুসলিমের চিরস্থায়ী বঞ্চনার বয়ান”।

আজকে বাংলাদেশে যখনই কোনো সাম্প্রদায়িক মব-ভায়োলেন্স ঘটে, যখনই কোনো সেক্যুলার চিন্তককে আক্রমণ করা হয়, কিংবা যখনই অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকে “আধিপত্যবাদী” বলে গালি দেওয়া হয়—তখনই ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো আহমদ সফার এই ‘ভিকটিমহুড’ তত্ত্বকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তারা যুক্তি দেয়: “এগুলো তো ঐতিহাসিক বঞ্চনা থেকে আসা জনগণীয় ক্ষোভের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ!”

সফা এই ভয়াবহ বুদ্ধিবৃত্তিক চাবুকটি ডানপন্থীদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তিনি ক্ষোভকে নীতিগত রূপ দিয়েছেন, ঈর্ষাকে প্রগতির পোশাক পরিয়েছেন এবং উগ্র গরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতিকে সাম্যবাদের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।

ভিকটিমহুডের শৃঙ্খল ভেঙে বের হওয়ার সময়

আহমদ সফার ‘ভিকটিমহুড রাজনীতি’ বাঙালি মুসলিম সমাজকে কোনো মুক্তির পথ দেখায়নি; বরং তাদের এক চিরন্তন আত্মদয়ার (Self-pity) এবং ক্ষোভের অন্ধকার বাক্সে বন্দী করে রেখেছে। যে জনগোষ্ঠী নিজেকে কেবলই ‘অন্যের দ্বারা নির্যাতিত শিকার’ মনে করে, সে কখনো নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না; সে কেবল ধ্বংস করতে শেখে।

সফামন প্রগতির প্রচ্ছদে এমন এক বিষাক্ত মনস্তত্ত্ব তৈরি করেছে, যা সামাজিক ক্ষত নিরাময়ের বদলে সেই ক্ষততে ক্রমাগত লবণ ছিটিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দোকান টিকিয়ে রাখে।

বাংলাদেশকে যদি সত্যিকার অর্থে একটি অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে আহমদ সফার তৈরি এই কুখ্যাত ‘ভিকটিমহুড কার্ড’কে চিহ্নিত করতে হবে এবং আত্মদয়া ও ক্ষোভের এই প্রতিক্রিয়াশীল দর্শনকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।