কিছু গান শুধু সুর ও কথার সমন্বয় নয়; সময়ের সীমানা পেরিয়ে সেগুলো ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। কিছু কণ্ঠ শুধু সংগীত পরিবেশন করে না, ধারণ করে একটি জাতির স্বপ্ন, সংগ্রাম, বেদনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। শিল্পী অংশুমান রায়ের কণ্ঠে গাওয়া ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’ তেমনই একটি গান, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
১৯ আগস্ট ১৯৩৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম শহরের বাছুরডোবায় জন্মগ্রহণ করেন অংশুমান রায়। লোকসংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং নিজস্ব কণ্ঠসাধনার মাধ্যমে তিনি বাংলা গানের জগতে পরিচিতি লাভ করেন। জীবনের শুরুতে তিনি সরকারি চাকরিতে যুক্ত ছিলেন। পরে সংগীতের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিয়ে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি সংগীতচর্চায় মনোনিবেশ করেন।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি লোকসংগীত, আধুনিক গান এবং চলচ্চিত্রের গানসহ বিভিন্ন ধারায় গান করেছেন। ‘ভাদ্র আশ্বিন মাসে ভ্রমর লাগে কাঁচা বাঁশে’ এবং ‘দাদা পায়ে পড়ি রে, মেলা থেকে বউ এনে দে’-এর মতো গান তাঁকে দুই বাংলার শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। তবে তাঁর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া গানটি।
যে গান হয়ে উঠেছিল মুক্তির প্রতিধ্বনি
‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’ গানটির কথা লিখেছিলেন প্রখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। সুর ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন অংশুমান রায়।
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতায় একটি চায়ের আড্ডায় গানটির জন্ম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে কেন্দ্র করে গানটি রচিত হয়। সে সময় আকাশবাণী কলকাতার ‘সংবাদ-বিচিত্রা’ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সঙ্গে গানটি প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ভাষণের সঙ্গে একটি গান যুক্ত করার পরিকল্পনা থেকেই গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার গানটির কথা লিখে দেন এবং অংশুমান রায় তাতে সুরারোপ করে কণ্ঠ দেন।
গানটি প্রচারের পর দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে এর কথায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং বাঙালির সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার আহ্বানের সঙ্গে গানটির সুর ও কথা যেন একটি সাংস্কৃতিক সমান্তরাল ভাষা তৈরি করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্তের দুই পাশেই গানটি পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও গানটির পরিবেশন শোনা যায়। সংগীতশিল্পী মোহাম্মদ আবদুল জব্বারও গানটি কণ্ঠে ধারণ করেন। ফলে গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের স্মারক হিসেবে আরও বিস্তৃত পরিচিতি পায়।
বাংলাদেশের প্রতি গভীর টান
অংশুমান রায়ের বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল একটি জনপ্রিয় গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর পারিবারিক শিকড়ও বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁর পূর্বপুরুষদের বসতি ছিল রাজশাহীতে। ফলে বাংলাদেশের প্রতি তাঁর সাংস্কৃতিক ও আবেগের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই গানের জন্য অংশুমান রায় ও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু ওই বছরের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সেই সম্মাননা আর প্রদান করা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘ সময় পর স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাঁর অবদান আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। ২০১২ সালের ২৭ মার্চ অংশুমান রায়কে মরণোত্তর ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার। ঢাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন তাঁর ছেলে ও সংগীতশিল্পী ভাস্কর রায়।
দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন
অংশুমান রায়ের সংগীতজীবন ছিল বহুমাত্রিক। তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত গানটি তাঁকে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তিনি ভারতের শিল্পী হলেও তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে এ দেশের মানুষের কাছেও আপন করে তুলেছিল।
১৯৭১ সালে সংগীত ছিল শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; তা হয়ে উঠেছিল জনমত গঠন, মানুষের মনোবল জাগানো এবং স্বাধীনতার পক্ষে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। সেই সময়ের বহু গান মানুষের মধ্যে সাহস ও প্রত্যয়ের অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল। অংশুমান রায়ের গানও সেই ধারার অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি।
১৯৯০ সালের ২২ এপ্রিল তিনি প্রয়াত হন। তাঁর শারীরিক উপস্থিতি আজ নেই, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা গানটি এখনও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। বিশেষ করে ১৯ আগস্ট তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করলে ফিরে আসে সেই সময়, যখন গান, কবিতা, নাটক ও বেতার অনুষ্ঠান মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে উঠেছিল।
অংশুমান রায়ের শিল্পীসত্তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো এখানেই—তিনি এমন একটি গান কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন, যা একটি নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও ইতিহাসের স্মারক হয়ে আছে।
‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’ আজও সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। একটি মানুষের কণ্ঠ কীভাবে একটি জাতির সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে, গানটি তারই এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
১৯ আগস্ট অংশুমান রায়ের জন্মদিনে তাই তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন শিল্পীকে স্মরণ করা নয়; বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সংগীতের ভূমিকা এবং দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কেও স্মরণ করা।
অংশুমান রায়ের কণ্ঠ থেমে গেছে বহু বছর আগে। কিন্তু তাঁর গানের প্রতিধ্বনি থামেনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে, মানুষের সংগীতচেতনায় এবং দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তিনি আজও স্মরণীয়—একজন শিল্পী, একজন সুহৃদ এবং মুক্তিযুদ্ধের গানের এক অমর কণ্ঠ হিসেবে।









