বীমা খাতের পরিচালনা পর্ষদে প্রযুক্তির ভূমিকা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। অতীতে যেখানে প্রযুক্তিকে মূল আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে খুব বেশি দেখা যেত না, সেখানে এখন এটি নির্বাহী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোই বদলে দিচ্ছে। ফলে বোর্ডরুমের আলোচনায় নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে, যা সরাসরি ব্যবসার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে।
ফেডারাটো কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা উইল রস তাঁর বক্তব্যে বলেন, বর্তমানে বীমা শিল্পে সাইবার নিরাপত্তা, সামাজিক মূল্যস্ফীতি এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসবই এখন নিয়মিতভাবে শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার অংশ।
তিনি আরও জানান, বাস্তবতা হলো অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার ও সার্ভারভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে চলছে। বিশেষ করে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এই সীমাবদ্ধতা ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উইল রস বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়ে যত আলোচনা হোক না কেন, মূল গুরুত্ব দেওয়া উচিত ভিত্তিগত প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলোর সমাধানে। তাঁর মতে, শুধু নতুন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে বিদ্যমান কাঠামোর দুর্বলতা দূর করাই বেশি জরুরি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বীমা শিল্পকে অনেক সময় স্থিতিশীল মনে করা হলেও এই স্থিতিশীলতা সবসময় দক্ষতার প্রতিফলন নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন টিকে থাকলেও তাদের কার্যপ্রণালী যথেষ্ট কার্যকর নয়।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একসময় বীমা কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্স কাছাকাছি অবস্থানে থাকত, কিন্তু এখন সেই ভারসাম্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কিছু কোম্পানি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, আবার কিছু পিছিয়ে পড়ছে। এই পার্থক্যের পেছনে মূল কারণ হিসেবে তিনি তথ্য ব্যবহারের সক্ষমতাকে চিহ্নিত করেন।
তার মতে, আধুনিক যুগে যারা তথ্যকে ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে, তারাই এগিয়ে থাকে। আর এখন এই সক্ষমতা অনেকাংশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কেবল স্বয়ংক্রিয়করণকে সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কারণ সব সুবিধা শুধু অটোমেশন থেকেই আসবে—এই ধারণা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে বীমা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার অনেক বেশি বিস্তৃত, তাই এখানে ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাবও বড় হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সফটওয়্যার খাতে কর্মী ব্যয় যেখানে মোট ব্যয়ের বড় অংশ, সেখানে বীমা খাতে তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তাই শুধুমাত্র মানবশক্তি প্রতিস্থাপন করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং কোথায় অদক্ষতা তৈরি হচ্ছে, সেটি গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন।
তার মতে, বীমা খাতে প্রকৃত অদক্ষতা দেখা যায় মূলধন ও ঝুঁকির সঠিক বণ্টনে। অনেক সময় পুনর্বীমা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর ও মধ্যবর্তী কাঠামোর কারণে লাভের একটি বড় অংশ কমে যায়, যা পুরো ব্যবস্থাকে কম কার্যকর করে তোলে।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার তখনই সফল হবে যখন এটি এমন কাজ করতে পারবে যা মানুষ করতে পারে না। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, জটিল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় মানুষের অংশগ্রহণ সম্পূর্ণভাবে বাদ দিলে তা নতুন নির্ভরশীলতা তৈরি করতে পারে, যা ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়াতে পারে।
সবশেষে তিনি মন্তব্য করেন, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা সমাধান না করে শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে, তবে অদক্ষতা আরও বেড়ে যেতে পারে এবং তা সময়ের সঙ্গে আরও জটিল আকার ধারণ করবে।









