১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে কেবল একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের ভৌগোলিক মৃত্যু ঘটেনি, বরং জিন্নাহর ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ (Two-Nation Theory)-র রাজনৈতিক অকার্যকারিতা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমানিত হয়েছিল। ভাষা, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তিতে অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রগতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দলিল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism), জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রের মূল চার নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। এটি ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা সহাবস্থানভিত্তিক যৌথ নাগরিক জাতীয়তাবাদ (Civic Secular Nationalism) প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সুযোগ।
কিন্তু রাজনৈতিক ময়দানে পাকিস্তানের পতন ঘটলেও, বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে ‘মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদ’-এর পরাচ্ছায়াকে টিকিয়ে রাখার এক চতুর চক্রান্ত শুরু করেন আহমদ সফা। ১৯৭১-এর অসাম্প্রদায়িক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দ্বিজাতিতত্ত্বের রাষ্ট্রীয় পরাজয় ঘটলেও, সফা তাঁর লেখালেখি ও তাত্ত্বিক বয়ানের মাধ্যমে সেই উগ্র সম্প্রদায়ভিত্তিক পরিচয়ের ‘মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি’ পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন করেছেন। এই পর্বের মূল ময়নাতদন্ত হলো: পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার পরও কীভাবে ছফামন সেক্যুলার জাতীয়তাবাদকে “অবাস্তব” ও “পরের সংস্কৃতি” আখ্যা দিয়ে বাঙালি মুসলিম সমাজে সেই পুরনো দ্বিজাতিতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্যবোধকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
১. ১৯৭১-এর সেক্যুলার নাগরিক সম্ভাবনার মুখে ছফীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা
১৯৭১-এর স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রয়োজন ছিল একটি প্রগতিশীল, বৈজ্ঞানিক ও অসাম্প্রদায়িক নাগরিক সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় হবে ব্যক্তির সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি হবে সম-অধিকারভিত্তিক নাগরিকতা।
কিন্তু আহমদ সফা স্বাধীনতার পরপরই রচিত তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (১৯৭২) এবং পরবর্তী প্রবন্ধগুলোতে এই সেক্যুলার সম্ভাবনাকে স্বাগত না জানিয়ে, এর মধ্যে “বাঙালি মুসলিম অস্তিত্বের ভয়াবহ সংকট” দেখতে পান।
সফা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (১৯৭২) গ্রন্থে লিখছেন:
“পাকিস্তান ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু বাঙালি মুসলমান কি তার ঐতিহাসিক ভয় এবং স্বাতন্ত্র্যের সংকট থেকে মুক্ত হতে পেরেছে? প্রমিত সেক্যুলারিজমের নামে যদি বাঙালি মুসলমানের অবচেতনকে চেপে রাখা হয় এবং কলকাতার অনুসরণে এক কৃত্রিম সেক্যুলার সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে বাঙালি মুসলমান আবার নিজের ঘরের মধ্যে পরবাসী বোধ করবে।”
এই যুক্তির পেছনের চতুর সাম্প্রদায়িক মনস্তত্ত্ব উন্মোচন করা যাক:
- সেক্যুলারিজমকে ‘ভীতিপ্রদর্শন’ হিসেবে খাড়া করা: মুক্তিযুদ্ধের সেক্যুলার চেতনাকে নাগরিক মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে না দেখে, সফা তাকে বাঙালি মুসলিমকে “পরবাসী করার চক্রান্ত” হিসেবে চিত্রায়িত করলেন।
- পাকিস্তানপতন সত্ত্বেও দ্বিজাতিতাত্ত্বিক আশঙ্কার জিগির: পাকিস্তান ভাঙার পর রাষ্ট্র ছিল শতভাগ বাঙালি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের হাতে। এখানে মুসলিম পরিচয় হারিয়ে যাওয়ার কোনো বস্তুগত ভয় ছিল না। তা সত্ত্বেও সফা কাল্পনিক “সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের” ভয় দেখিয়ে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদের সেই পুরনো জিন্নাহীয় বর্মটিকে পুনরায় সচল রাখার ব্যবস্থা করলেন।
২. রাজনৈতিক পরাজয় বনাম মানস-দ্বিজাতিতত্ত্বের পুনর্নির্মাণ
সফা খুব কৌশলগতভাবে রাষ্ট্রীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ‘মনস্তাত্ত্বিক দ্বিজাতিতত্ত্ব’ (Psychological Two-Nation Theory) খাড়া করেন।
[১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশ: দুই বিপরীত তাত্ত্বিক পথ]
│
┌───────────────────────────────┴───────────────────────────────┐
▼ ▼
[১৯৭২-এর প্রগতিশীল সেক্যুলার মডেল] [ছফীয় মনস্তাত্ত্বিক দ্বিজাতিতাত্ত্বিক মডেল]
• দ্বিজাতিতত্ত্বের চূড়ান্ত পতন ও সেক্যুলার রাষ্ট্রের সূচনা • রাজনৈতিক পাকিস্তান ভাঙলেও 'মুসলিম মনস্তাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্য' অপরিবর্তনীয়
• ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নাগরিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা • সেক্যুলার জাতীয়তাবাদকে 'বর্ণহিন্দু সংস্কৃতির অনুকরণ' আখ্যা দান
• যৌথ ভাষা ও ইতিহাসভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণ • 'বাঙালি মুসলিম অবচেতন'-কে সেক্যুলার আধুনিকতার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো
*ফলাফল:* অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক নাগরিক রাষ্ট্র structure *ফলাফল:* ৭৫-পরবর্তী উগ্র ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক জমিন
“বাঙালি মুসলমান যখন নিজেকে কেবল ‘বাঙালি’ বলে ভাবতে চেষ্টা করে, তখন সে নিজের অজান্তেই তার শতবছরের ইতিহাস ও ধর্মের শিকড় কেটে ফেলে। ১৯৭১ তাকে একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্র দিয়েছে, কিন্তু তার ভেতরের ‘মুসলিম মনস্তত্ত্ব’কে মুছে ফেলতে পারেনি। এই মনস্তত্ত্বকে অস্বীকার করে যে সেক্যুলারিজম গড়ার চেষ্টা হচ্ছে, তা বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য।”
এখানে সফা যা করেছেন, তা মূলত জিন্নাহর ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবেরই এক মনস্তাত্ত্বিক রি-প্যাকেজিং। জিন্নাহ বলেছিলেন মুসলিমদের রাজনীতি আলাদা, আর সফা ১৯৭১-এর পর বললেন মুসলিমদের “মনস্তত্ত্ব ও সংস্কৃতি” চিরকালের জন্য আলাদা।
৩. ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ (১৯৮১): সেক্যুলারিজমকে ‘আত্মবিস্মৃতি’ বানানোর অপকৌশল
১৯৮১ সালে প্রকাশিত ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে সফা সেক্যুলারিজম ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সরাসরি আক্রমণ করেন। তিনি দাবি করেন যে, ১৯৭১-এর পর বাংলাদেশে যে সেক্যুলার সংস্কৃতির চর্চা করা হচ্ছে, তা নাকি বাঙালি মুসলিমের জন্য একধরনের “মানসিক দাসত্ব”।
সফা যুক্তি দেন:
১. বাঙালি মুসলিমের একটি “আলাদা অবচেতন মন” আছে, যা রবীন্দ্রসংস্কৃতি বা সেক্যুলার প্রমিত ধারার সঙ্গে খাপ খায় না।
২. সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ চর্চা করা মানে বাঙালি মুসলিমের “নিজের পরিচয়কে অস্বীকার করা”।
৩. যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সংস্কৃতিতে এই “মুসলিম স্বাতন্ত্র্য”কে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ ১৯৭১-এর স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ।
এই তাত্ত্বিক ফ্রেমটি ছিল অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর মাধ্যমে সফা এক সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতিকে শেখালেন যে—ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া মানে নিজের ধর্মের প্রতি অবিশ্বস্ত হওয়া, আর অসাম্প্রদায়িক নাগরিক জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করা মানে “পরের সংস্কৃতি মেনে নেওয়া”!
৪. ১৯৭৫-পরবর্তী উগ্র প্রতিক্রিয়াশীলতা ও ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে’র বুদ্ধিবৃত্তিক জ্বালানি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যার পর বাংলাদেশে যে সামরিক শাসন, ধর্মীয় রাজনীতির পুনর্বাসন এবং ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর উত্থান ঘটেছিল, তার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত তৈরিতে সফার লেখালেখি সবচেয়ে বড় জ্বালানি জুগিয়েছিল।
জিয়াউর রহমান যখন সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ছেঁটে ফেলে অসাম্প্রদায়িক ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর জায়গায় ধর্মীয় প্রলেপযুক্ত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ চালু করলেন, তখন সেই উগ্র রাজনৈতিক পদক্ষেপের সবচেয়ে বড় সাফাই এসেছিল ছফীয় সাহিত্য ও প্রবন্ধ থেকে।
- জিয়াউর রহমান যে “বাঙালি বনাম বাংলাদেশি” সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরি করেছিলেন, তার তাত্ত্বিক রূপরেখা সফা আগেই ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ ও প্রবন্ধাবলীতে লিখে রেখেছিলেন।
- সফা প্রগতিশীল ও বামপন্থী শব্দমালা ব্যবহার করে দেখিয়েছিলেন কীভাবে “বাঙালি জাতীয়তাবাদ মূলত ভারতের দালালি ও সেক্যুলার চক্রান্ত”, আর “মুসলিম স্বাতন্ত্র্যভিত্তিক বাংলাদেশি পরিচয়ই হলো প্রকৃত সার্বভৌমত্ব”!
৫. বর্তমান বাংলাদেশে ‘ছফামন’-এর বিষাক্ত প্রভাব
আজকের বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে সেক্যুলারিজম শব্দটিকে যেভাবে একটি “তুচ্ছ ও ধর্মবিরোধী” ধারণায় পরিণত করা হয়েছে, তার পেছনের প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক কারিগর আহমদ সফা।
- সেক্যুলারিজমের চরিত্রহনন: যখন উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো সেক্যুলারিজমকে “ইসলামবিরোধী চক্রান্ত” বা “নাস্তিকতা” বলে গালি দেয়, তখন তারা মূলত আহমদ সফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ থেকে উদ্ধৃতি সংগ্রহ করে।
- অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ‘ভারতের চক্রান্ত’ বলা: যখন বলা হয় যে ১৯৭১-এর অসাম্প্রদায়িক সংবিধান নাকি “বাংলাদেশের নিজস্ব চেতনা নয়, ভারতের চাপিয়ে দেওয়া জিনিস”, তখন তার পেছনে সফার ‘অলাতচক্র’ ও রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোর বিষাক্ত প্রভাব কাজ করে।
- ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদের ফ্যাসিজম: যখন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নাগরিক পরিচয়ের বদলে ধর্মীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার দাবি তোলা হয়, তখন তা সফার তৈরি করা “মুসলিম সাংস্কৃতিক ঘর” ধারণারই বিজয় ঘোষণা করে।
ভূখণ্ড স্বাধীন হলো, কিন্তু ‘ছফামন’ পরাধীনই রয়ে গেল
১৯৭১ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে ভূগোল থেকে মুছে গিয়েছিল, কিন্তু আহমদ সফা নিশ্চিত করেছিলেন যেন দ্বিজাতিতত্ত্বের সেই উগ্র, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সাম্প্রদায়িক আত্মাটি বাঙালি মুসলিমের মানসিকতায় জীবিত থাকে।
সফা ১৯৭১-এর মহান সেক্যুলার মুক্তির পর জাতিকে এক বিশ্বজনীন, যুক্তিবাদী ও মানবিক নাগরিক সমাজের দিকে নিয়ে যাওয়ার বদলে, পুনরায় এক আঁধারচ্ছন্ন ‘মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী’ গহ্বরে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা দেখলেও মনের স্বাধীনতা দেখতে পাননি; বরং প্রগতির প্রচ্ছদ পরে তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বের মনস্তাত্ত্বিক প্রহরী হিসেবে কাজ করেছেন। অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার মূল পূর্বশর্তই হলো—আহমদ সফার এই “পাকিস্তানি ভাবাদর্শের পুনর্জন্মদায়ী” মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থেকে জাতিকে মুক্ত করা।








