১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল, তা ছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ (Bengali Nationalism)। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে এই অসাম্প্রদায়িক নাগরিক জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এর মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল: রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক পরিচয় নির্ধারণে ধর্ম, বর্ণ বা ভূখণ্ডের চেয়ে অসাম্প্রদায়িক ভাষা ও সংস্কৃতির রূপই প্রধান এবং এ ভূমির সকল অধিবাসী সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে।
কিন্তু ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর এবং সামরিক শাসনের ছায়াতলে যখন রাষ্ট্রীয় অক্ষে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-কে প্রতিস্থাপন করে ধর্মপ্রলেপযুক্ত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ (Bangladeshi Nationalism) চালু করা হলো, তখন সেই রাজনৈতিক পদক্ষেপের প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক জ্বালানি ও তাত্ত্বিক কাঠামো জুগিয়েছিল আহমদ সফার চিন্তা। সফা অসাম্প্রদায়িক ভাষাভিত্তিক নাগরিক পরিচয়কে “কৃত্রিম” ও “উচ্চবর্ণের সংস্কৃতি” বলে আক্রমণ করে মূলত এক উগ্র ‘মুসলিম সংখ্যাগুরুভিত্তিক ভূখণ্ডগত পরিচয়বাদ’ (Territorial Identity Politics)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এই পর্বের ময়নাতদন্ত হলো: কীভাবে ছফীয় চিন্তাকাঠামো অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি দুর্বল করে ধর্মকেন্দ্রিক পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির অক্ষে ফিরিয়ে এনেছিল এবং পরবর্তীতে ডানপন্থী ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ জুগিয়েছিল।
১. ভাষাভিত্তিক নাগরিক জাতীয়তাবাদ বনাম ছফীয় ‘ভূখণ্ডীয়-ধর্মীয় পরিচয়বাদ’
সেক্যুলার ও নাগরিক জাতীয়তাবাদের মূল দর্শনে একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষ ভাষার যৌথ উত্তরাধিকার ও অসাম্প্রদায়িক আইনের মাধ্যমে নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় পরিচয় লাভ করে। কিন্তু আহমদ সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’, ‘রাজনীতি ও সংস্কৃতি’ এবং ‘আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি’ শীর্ষক প্রবন্ধগুলোতে ভাষাভিত্তিক এই জাতীয়তাবাদকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
সফার মূল যুক্তি ছিল: কেবল ‘ভাষা’ কোনো জনগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না; যদি না তার সাথে ভৌগোলিক সীমানা এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর “স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক অবচেতন” যুক্ত হয়।
সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ (১৯৮১) গ্রন্থে লিখছেন:
“বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তারা যে অখণ্ড ভাষার কথা বলেন, তা পূর্ববঙ্গের মুসলিম কৃষকের বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। শুধু ভাষা দিয়ে যদি পরিচয় নির্ধারিত হতো, তবে ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হতো না। পূর্ববঙ্গের মানুষের জাতীয়তাবাদের মূলে রয়েছে তাদের ভূখণ্ডগত সত্তা এবং তাদের মুসলিম সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য। এই দুটিকে বাদ দিয়ে কেবল ভাষিক ‘বাঙালি’ পরিচয়ের জিকির তোলা হলো বর্ণহিন্দু সংস্কৃতিকে পুনরায় চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত।”
- নাগরিকত্বকে সাম্প্রদায়িকীকরণ: সফা প্রমিত ভাষা ও সেক্যুলার জাতীয়তাবাদকে “উচ্চবর্ণের হিন্দু সংস্কৃতি” বলে দেগে দিয়ে বাঙালি পরিচয়কে সংকুচিত করলেন।
- ডানপন্থী রাষ্ট্রদর্শনের ভিত্তি নির্মাণ: জিয়াউর রহমান পরবর্তীতে সংবিধানে সংশোধন এনে (পঞ্চম সংশোধনী) অসাম্প্রদায়িক ‘বাঙালি’ পরিচয়ের স্থলে যে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ের রূপরেখা হাজির করেন, সফা তাঁর বহু আগেই সেই পরিচয়ের খসড়া লিখে রেখেছিলেন।
২. ছফীয় তত্ত্ব ও ডানপন্থী ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’: কাঠামোগত তুলনা
[জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দুই বিপরীত তাত্ত্বিক মডেল]
│
┌───────────────────────────────┴───────────────────────────────┐
▼ ▼
[সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদ (১৯৭২)] [ছফীয় অনুপ্রাণিত 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ']
• ভিত্তি: যৌথ ভাষা, অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার • ভিত্তি: ভূখণ্ডগত সীমানা, মুসলিম সংখ্যাগুরুত্ব ও উগ্র স্বাতন্ত্র্য
• লক্ষ্য: ধর্মনিরপেক্ষ, বিশ্বজনীন ও সমন্বয়বাদী রাষ্ট্র • লক্ষ্য: সেক্যুলারিজমকে 'পরের সংস্কৃতি' বলে বর্জন করা
• দৃষ্টিভঙ্গি: হিন্দু-মুসলিম-নৃগোষ্ঠীর যৌথ অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য • দৃষ্টিভঙ্গি: সেক্যুলারিজমকে 'ভারতীয় আধিপত্য' হিসেবে প্রচার করা
*ফলাফল:* অসাম্প্রদায়িক নাগরিক রাষ্ট্রকাঠামো *ফলাফল:* প্রতিক্রিয়াশীল পরিচয়বাদ ও ধর্মীয় রাজনীতির সামাজিক বৈধতা
“বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি বায়বীয় ধারণা। ভৌগোলিক সীমানা এবং এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে যে জাতীয়তাবাদ গড়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে।”
৩. সেক্যুলার জাতীয়তাবাদকে ‘উচ্চবর্ণের সংস্কৃতি’ বানানোর বিষময় ফল
আহমদ সফা তাঁর প্রবন্ধাবলীতে বারবার একটি চতুর কুযুক্তি ব্যবহার করেছেন: তিনি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে প্রগতিশীল বা মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে না দেখিয়ে তাকে “কলকাতাকেন্দ্রিক বর্ণহিন্দু কালচার” বলে গালি দিয়েছেন।
এই কৌশলটির প্রতিক্রিয়াশীল পরিণতি ছিল ভয়াবহ:
১. সংখ্যালঘুদের বিচ্ছিন্নকরণ: বাঙালি জাতীয়তাবাদ যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য নৃগোষ্ঠীকে একটি সমন্বিত অসাম্প্রদায়িক প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করেছিল, সেখানে সফা ‘মুসলিম ভূখণ্ডীয় স্বাতন্ত্র্য’-এর কথা বলে অমুসলিম অধিবাসীদের মানসিকভাবে “দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে” পরিণত করার পথ তৈরি করেন।
২. ইসলামিস্টদের বুদ্ধিবৃত্তিক তোষণ: উগ্র ধর্মভিত্তিক দলগুলো যখনই সেক্যুলার সংস্কৃতির (যেমন: মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী উৎসব, রবীন্দ্রচর্চা) বিরোধিতা করতে চেয়েছে, তখনই তারা সফার এই যুক্তি ব্যবহার করেছে—”এগুলো বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি নয়, এগুলো হিন্দুয়ানি প্রথা”!
৪. বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে ‘ছফীয় পরিচয়বাদে’র প্রভাব
আজকের বাংলাদেশে সেক্যুলার গণতন্ত্র ও প্রগতিশীল রাজনীতির যে গভীর সংকট দেখা যাচ্ছে, তার মূলে কাজ করছে সফার তৈরি করা এই “পরিচয়বাদী বিষবৃক্ষ”।
- আদর্শিক শূন্যতা ও সাম্প্রদায়িকীকরণ: বাংলাদেশে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো যখন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর নামে রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রতীক ও পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়, তখন তারা মূলত আহমদ সফার বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার বহন করে।
- মুক্তিযুদ্ধের সেক্যুলার ভিত্তি ধ্বংস: সফার এই ভূখণ্ডগত পরিচয়বাদের কারণে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে তার মূল সেক্যুলার চেতনা (ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্য) থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল “একটি ভূখণ্ডভিত্তিক ভৌগোলিক রাষ্ট্র লাভ” হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের বৈধতা: যখন জাতীয় পরিচয়কে ‘মুসলিম সংখ্যাগুরুত্ব’ ও ‘বাংলাদেশি ভূখণ্ড’ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তখন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে নিক্ষিপ্ত হয়—যার দার্শনিক অনুমোদন সফার লেখায় বিদ্যমান।
পরিচয়বাদী চক্রান্ত উন্মোচনের সময়
ভাষাকেন্দ্রিক অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর অন্য সম্প্রদায়ের আধিপত্য ছিল না; তা ছিল উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এদেশের গণমানুষের যৌথ সেক্যুলার প্রতিরোধ।
আহমদ সফা ভূখণ্ডগত স্বাতন্ত্র্যের নামে এবং প্রগতির চতুর মোড়কে আসলে সেই অসাম্প্রদায়িক সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তিমূলে কুঠারঘাত করেছেন। তিনি বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সম-অধিকারের রাষ্ট্র হতে না দিয়ে তাকে এক সংকীর্ণ ‘মুসলিম সংখ্যাগুরুভিত্তিক ভূখণ্ডগত ঘেরাটোপে’ বন্দি করে রেখে গেছেন। ডানপন্থী ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ও আধুনিক ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ মূলত আহমদ সফার এই ‘পরিচয়বাদী জাতীয়তাবাদ’-এরই ঔরসে জন্মগ্রহণ করেছে। একটি মুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী বাংলাদেশ পুনর্নির্মাণ করতে হলে আহমদ সফার এই প্রতিক্রিয়াশীল পরিচয়বাদী জাতীয়তাবাদকে সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে।







