দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের সহ্যাদ্রি পর্বতমালা ও কনকন উপকূলের বীরত্বগাথা-সংকূল মারাঠা ভূখণ্ড এবং প্রাচ্য ভারতের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বঙ্গভূমি—এই দুই সমৃদ্ধ সংস্কৃতির মননশীল ও রাজনৈতিক সম্পর্ক কোনো আকস্মিক আধুনিক ঘটনা নয়। ভারতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বম্বে (বর্তমান মুম্বাই) প্রেসিডেন্সি এবং বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ছিল ঔপনিবেশিক ভারতের অর্থনৈতিক, আইনি ও সামাজিক রূপান্তরের দুই মূল শক্তিকেন্দ্র। আরব সাগরের বাণিজ্যিক রুট, ব্রিটিশ প্রশাসনিক কাঠামো, উনিশ শতকের সমাজসংস্কার আন্দোলন, ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম, বোম্বাই কেন্দ্রিক হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্প এবং একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত অর্থনীতি—সবকিছু মিলিয়ে মহারাষ্ট্রের মাটিতে বাঙালির পদচারণা ও স্থায়ী বসতি স্থাপনের ইতিহাস অত্যন্ত প্রজ্ঞাময়, গতিশীল ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত।
মহারাষ্ট্র ও বাংলার মননশীল সম্পর্কের প্রারম্ভিক সূত্রপাত ঘটেছিল উনিশ শতকের সামাজিক ও বৈচারিক নবজাগরণের মধ্য দিয়ে। ১৮৬০ ও ১৮৭০-এর দশকে বাংলার ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারমুখী চিন্তা যখন বোম্বাই ও পুনেতে তরঙ্গায়িত হয়, তখন মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, রামকৃষ্ণ গোপাল ভাণ্ডারকর এবং আত্মারাম পান্ডুরঙ্গের মতো দূরদর্শী মারাঠি মনীষীরা বাংলায় কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে গভীর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপে যুক্ত হন। এর ফলে বোম্বাইয়ে গঠিত হয় ‘প্রার্থনা সমাজ’, যা তৎকালীন মারাঠি সমাজের কুপমণ্ডূকতা দূরীকরণে বাংলায় সূচিত নবজাগরণের ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। একই সময়ে প্রশাসনিক সূত্রে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সত্যেন্দ্রনাথ তাগোর—যিনি ছিলেন ভারতের প্রথম ভারতীয় সিভিল সার্ভিস (ICS) কর্মকর্তা—মহারাষ্ট্রের সাতারা, সোলাপুর ও আহমেদনগরে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মসূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৭৮ ও ১৮৯৩ সালে একাধিকবার মহারাষ্ট্রে যান এবং খণ্ডালা ও পুনেতে অবস্থানকালীন তাঁর বেশ কিছু বিখ্যাত কবিতা ও গদ্য রচনা করেন।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেঙ্গল ও মারাঠা ভূখণ্ডের যৌথ অবদান ছিল সর্বাধিক ত্বরান্বিত ও বৈপ্লবিক। উনিশ শতকের শেষভাগে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক এবং বিপিনচন্দ্র পালের প্রজ্ঞাময় বন্ধুত্ব ‘লাল-বাল-পাল’ (লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক ও বিপিনচন্দ্র পাল) নামক ঐতিহাসিক জাতীয়তাবাদী অক্ষ গড়ে তোলে। তিলকের উদ্যোগে প্রবর্তিত ‘শিবাজী উৎসব’ এবং ‘গণপতি উৎসব’ খুব দ্রুত বাংলায় জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করার হাতিয়ার হিসেবে প্রবর্তিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং ‘শিবাজী-উৎসব’ কবিতা রচনা করে মারাঠা গৌরব ও বঙ্গীয় মননের ঐতিহাসিক মৈত্রী ঘোষণা করেছিলেন। একই সাথে বাংলার অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের গোপন রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের সাথে পুনে ও বোম্বাইয়ের সশাস্ত্র বিপ্লবীদের (যেমন চাপেকার ভ্রাতৃদ্বয় ও সাভারকর অনুগামীরা) নিবিড় যোগাযোগ তৈরি হয়, যা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে দুই বীরপ্রসূ জনপদকে এক সুতোয় গেঁথেছিল।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বোম্বাই ভারতের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে মহারাষ্ট্রে বাঙালির স্থানান্তরের এক বিশাল নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হয়। কলকাতার ‘নিউ থিয়েটার্স’-এর পতনের পর ভারতীয় চলচ্চিত্রের মূল কেন্দ্র যখন বোম্বাইয়ে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে, তখন বাঙালি নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা, গায়ক ও কলাকুশলীরা বোম্বাই চলচ্চিত্র শিল্পকে (বলিউড) বৈশ্বিক রূপ দিতে নেতৃত্ব দেন। বিমল রায়, ঋষিকেশ মুখার্জী, বাসু চ্যাটার্জী, শচীন দেব বর্মন, রাহুল দেব বর্মন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, কিশোর কুমার এবং অশোক কুমারের মতো কালজয়ী ব্যক্তিত্বরা কেবল বোম্বাইয়ের হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্পকে ভারতীয় জাতীয় চেতনার দর্পণ বানাননি; বরং তাঁরা বোম্বাই শহরের হৃদয়ে বঙ্গীয় সংস্কৃতির এক অবিনশ্বর আসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রখ্যাত স্যার জে. জে. স্কুল অব আর্টসে শিক্ষকতা ও শিল্পচর্চার মাধ্যমেও বহু বাঙালি চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর মারাঠা শিল্পকলাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাস্তুচ্যুত বাঙালি হিন্দু শরণার্থীদের পুনর্বাসনের একটি উল্লেখযোগ্য মানবিক অধ্যায় লিখিত হয়েছিল মহারাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় বিদর্ভ অঞ্চলে। ভারত সরকারের জাতীয় পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় তৎকালীন অখণ্ড মধ্য প্রদেশ ও বোম্বাই রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা চন্দ্রপুর (কোমারাম ভীম অঞ্চল) এবং গডচিরোলি জেলার বনাঞ্চলে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত বাঙালি পরিবারকে কৃষিজমি দেওয়া হয়। দুর্গম জঙ্গল ও প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও মেদিনীপুর, ফরিদপুর ও বরিশাল থেকে আসা এই কঠোর পরিশ্রমী বাঙালি কৃষকেরা নিজেদের শ্রমের বলে চন্দ্রপুরের বনাঞ্চলকে সোনালী ধান ও সবজি উৎপাদনের উর্বর কৃষিভূমিতে রূপান্তরিত করেন। আজ বিদর্ভের এই অংশটি মহারাষ্ট্রের বুকে এক স্বকীয় ‘ছোট বাংলা’ হিসেবে গড়ে উঠেছে।
মহারাষ্ট্রের শিল্প ও অর্থনৈতিক কাঠামোর নেপথ্যে বাঙালি কারিগরদের ভূমিকা অপরিসীম। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকেই অবিভক্ত বাংলার মেদিনীপুর, হুগলী ও হাওড়া জেলা থেকে যাওয়া অত্যন্ত দক্ষ স্বর্ণশিল্পীরা (সোনার কারিকর) মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক জাভেরি বাজার (Zaveri Bazar) এবং পুনের সোনার মার্কেটের প্রধান অলংকারশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁদের হাতের জটিল ও সূক্ষ্ম অলংকারশৈলী মুম্বাইকে ভারতের প্রধান স্বর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রে রূপ দিতে অনুঘটকের কাজ করেছে। পাশাপাশি অবকাঠামো নির্মাণ, জাহাজ নির্মাণ ও টেক্সটাইল খাতে হাজার হাজার বাঙালি শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও শ্রম মুম্বাই এবং থানে জেলার শিল্পাঞ্চলকে নিরন্তর সচল রেখেছে।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আর্থিক রাজধানী মুম্বাই এবং শিক্ষা ও আইটি নগরী পুনে নতুন প্রজন্মের উচ্চশিক্ষিত বাঙালি পেশাজীবীদের প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI), বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE), স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং শীর্ষস্থানীয় করপোরেট ও বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোতে হাজার হাজার বাঙালি অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, সিএ এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত দাপটের সাথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে পুনের প্রখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ (যেমন এফটিআইআই, পুনে বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি) এবং হিঞ্জেওয়াড়ি আইটি পার্কে প্রজ্ঞাবান বাঙালি গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের সক্রিয় উপস্থিতি মহারাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে আরও গতিশীল করেছে।
মহারাষ্ট্রে বসবাসকারী বিশাল বাঙালি সমাজ সজাতীয় ঐতিহ্য সযত্নে লালন করার পাশাপাশি স্থানীয় মারাঠি সংস্কৃতির সাথে এক অপূর্ব সামাজিক মেলবন্ধন তৈরি করেছে। ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ‘দাদর বেঙ্গল ক্লাব’ মুম্বাইয়ের সর্ব প্রাচীন বাঙালি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যার শিবাজী পার্কের দুর্গাপূজা আজ পুরো মহারাষ্ট্রের সামাজিক ইতিহাসের অন্যতম অঙ্গ। দাদর, লোকান্দওয়ালা, বান্দরা, নভি মুম্বাই এবং পুনের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত শতাধিক সর্বজনীন দুর্গাপূজা, রবীন্দ্রজয়ন্তী ও পয়লা বৈশাখ উদযাপনে মারাঠি প্রতিবেশীরাও সমভাবে অংশ নেন। দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের ফলে বহুপ্রজন্মের বাঙালিরা যেমন সাবলীলভাবে মারাঠি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছেন, তেমনি মারাঠি সমাজও বাঙালির সাহিত্যপ্রীতি ও প্রজ্ঞাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করেছে। আরব সাগরের তীরে সহ্যাদ্রির ছায়ায় গড়ে ওঠা মহারাষ্ট্রের বাঙালি সম্প্রদায় আজ নিছক কোনো প্রবাসী গোষ্ঠী নয়; বরং তাঁরা ভারতের এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিকেন্দ্রের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামগ্রিক প্রগতির এক চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য মহীরুহ।








