খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুন ২০২৬, ১১:৪৫ এএম

তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারা দেশে আবারও প্রকট হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ সংকট। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাও লোডশেডিংয়ের বাইরে থাকছে না। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দেশের অন্তত সাতটি জেলায় বিক্ষোভ, মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ এবং কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। জ্বালানি ঘাটতির কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর সঙ্গে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি, বৈরী আবহাওয়ায় কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন, রাতের বেলায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জিং এবং গভীর রাত পর্যন্ত চলা ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচকে কেন্দ্র করে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
Table of Contents
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবিলায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং রেকর্ড করা হয় শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে। তখন জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। রোববার রাত ৮টায় চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট, কিন্তু ঘাটতি ছিল প্রায় ১ হাজার ৯৮৩ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগে মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেত। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। রাত ১০টার পর থেকেই চাহিদা বাড়তে থাকে এবং মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন গ্রামীণ এলাকার গ্রাহকেরা। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন অনেক এলাকায় দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েক দিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও দিনে দুই থেকে তিন দফায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের ঘটনা ঘটছে।
অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি, নেত্রকোনা, রাজশাহী, শেরপুর, সিলেট এবং ঢাকা জেলার দোহারে বিক্ষোভ হয়েছে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় ফুটবল বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ জনতা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল কার্যালয়ে হামলা চালায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এলাকায় ২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯ মেগাওয়াট। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
টাঙ্গাইলের জামুর্কীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে দেলদুয়ার ও মির্জাপুর উপজেলার বাসিন্দারা পল্লী বিদ্যুতের সাবস্টেশনের সামনে মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা সাবস্টেশনে ভাঙচুরেরও চেষ্টা করে।
ঢাকার দোহারের নুরপুর এলাকায় গ্রাহকেরা পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও করে মানববন্ধন করেন এবং ঢাকা-দোহার সড়ক অবরোধ করেন। ঝালকাঠিতে প্রেস ক্লাবের সামনে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ এলাকায় বিদ্যুতের দাবিতে সড়ক অবরোধ করা হয়। ক্ষুব্ধ জনতা স্থানীয় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের বাইরে থাকা ৩৩ কেভি অটোমেটিক সার্কিট রিক্লোজার বন্ধ করে দেয়। এ ঘটনাতেও থানায় অভিযোগ করেছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
রাজশাহীর বাগমারায় লোডশেডিংয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে বের হওয়া পল্লী বিদ্যুতের প্রচারযান আটকে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। শেরপুরের নকলা ও ঝিনাইগাতীতেও বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে না পেরে ক্ষুব্ধ মানুষ পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
চলমান সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি জানান, একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারের টিউবে আকস্মিক লিকেজ দেখা দেওয়ায় কেন্দ্রটি জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করতে হয়েছে। একই সময়ে বঙ্গোপসাগরের বৈরী আবহাওয়ার কারণে একটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা খালাস ব্যাহত হওয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।
এই দুটি কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন একযোগে কমে গেছে বলে তিনি জানান। এর প্রভাব রাজধানীসহ সারা দেশেই পড়েছে। পরিস্থিতিকে সাময়িক জাতীয় সংকট উল্লেখ করে তিনি জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।
চলমান তাপপ্রবাহ বিদ্যুতের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফ্যানসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ছাড়া রাত ১০টার পর সারাদেশে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জিং শুরু হওয়ায় গভীর রাতেও বিদ্যুতের চাহিদা কমছে না। একই সঙ্গে রাত ১১টা থেকে ভোর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিদ্যুতের ব্যবহার অনেক বেশি থাকছে।
অন্যদিকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া, কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন হ্রাস এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিপুল বকেয়া বিলও সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বকেয়া প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বকেয়া অর্থের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সংগ্রহেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম জানান, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় কয়েক দিন ধরে ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদিত হচ্ছিল। তবে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানোয় পরিস্থিতির আংশিক উন্নতি হয়েছে। একই সময়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় উৎপাদনে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। শেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি অফিস, সাবস্টেশনসহ ১১টি স্থাপনায় নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। দেশের আরও কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদা কমানোই সংকট নিরসনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বৃষ্টিপাত শুরু হলে তাপমাত্রা কমবে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহারও কমবে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে এলে লোডশেডিংয়ের চাপও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে।
মন্তব্য