তরুণ প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়ার বিশেষ কর্মসূচি ‘উদ্যোগ’ চলতি আগস্টের মধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের আট জেলার সব উপজেলায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। পরে এর পরিধি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী জানুয়ারি থেকে দেশব্যাপী কর্মসূচিটির বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে।
নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের তুলনামূলক কম খরচে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে যাঁদের ব্যবসার ধারণা ও পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু প্রচলিত ব্যাংকঋণের জন্য প্রয়োজনীয় জামানত দেওয়ার সক্ষমতা নেই, তাঁদের জন্য এই কর্মসূচি একটি বিকল্প অর্থায়নের পথ তৈরি করতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে তিন বছর মেয়াদি ঋণ কর্মসূচির আওতায় সর্বোচ্চ ২৮ বছর বয়সী উদ্যোক্তাদের বিবেচনা করা হবে। আগস্টের শেষ দিক থেকে আট বিভাগের আট জেলার সব উপজেলায় কর্মসূচিটির পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন শুরু হবে। এই পর্যায়কে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সক্রিয়করণ পর্যায়’ হিসেবে বিবেচনা করছে। পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে দেশব্যাপী কর্মসূচি চালু করা হবে।
বিশেষ এই অর্থায়ন প্যাকেজের মোট আকার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে রাখা হয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা কোনো নতুন তহবিল গঠন না করে বিদ্যমান পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি থেকে ঋণের অর্থ জোগানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যদিকে অনুদানের অর্থের একটি অংশ ব্যাংকগুলোর অব্যবহৃত সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থ থেকে জোগান দেওয়ার কথা রয়েছে।
কর্মসূচির আওতায় একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ পেতে পারেন। এর সঙ্গে সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে নির্ধারিত থাকবে। তবে এই অনুদানের অর্থ সরাসরি ঋণগ্রহীতার হাতে দেওয়া হবে না; ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও শর্ত পূরণের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো উদ্যোক্তা যদি ১০ লাখ টাকা ঋণ নেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা পরিশোধ করেন, তাহলে অনুদানের অংশ নিয়ে তাঁকে কোনো অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। কিন্তু ঋণের কোনো অংশ খেলাপি হলে, সেই খেলাপি অংশের সমপরিমাণ অনুদানের অর্থও ঋণের সঙ্গে যুক্ত হবে। অর্থাৎ সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করলে উদ্যোক্তার আর্থিক দায় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে।
ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটিও প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় কিছুটা আলাদা রাখা হয়েছে। সর্বোচ্চ ২৮ বছর বয়সী আগ্রহী উদ্যোক্তারা প্রথমে আবেদন করবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই ও বিভিন্ন ধরনের অনুসন্ধান শেষে আবেদনকারীদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবে।
সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা উদ্যোক্তাদের পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট উপজেলায় দিনব্যাপী একটি অধিবেশনে অংশ নিতে হবে। সেখানে তাঁরা নিজেদের ব্যবসার কাঠামো, পরিকল্পনা, সম্ভাব্য কার্যক্রম এবং অর্থ ব্যবহারের পদ্ধতি একটি বিশেষ কমিটির সামনে উপস্থাপন করবেন। সেই উপস্থাপনা ও যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ঋণ অনুমোদনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে বাণিজ্যিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অভিজ্ঞ ও পরিচিত উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শ্রেণিভুক্ত কাউকে এই কমিটিতে রাখা হবে না।
প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন উদ্যোক্তাকে এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় নির্বাচনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ের বাস্তবায়নে নির্বাচিত উপজেলাগুলোতে স্থানীয়ভাবে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি ব্যবসায়িক উদ্যোগে অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে।
বাংলাদেশে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জামানত ও ঋণগ্রহণের আনুষ্ঠানিক শর্ত পূরণ করা। নতুন উদ্যোগটির বিশেষত্ব হচ্ছে, প্রচলিত জামানতের ওপর নির্ভর না করে উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, সম্ভাবনা এবং যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা।
কর্মসূচিটির পেছনে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের পর বৈষম্যহীন সুযোগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে এই উদ্যোগকে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে কর্মসূচিটির সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে উদ্যোক্তা বাছাই, ঋণের যথাযথ ব্যবহার, ব্যবসার বাস্তব সম্ভাবনা যাচাই এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপর। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এসব বিষয়ে পাওয়া অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে দেশব্যাপী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী জানুয়ারি থেকে ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচিকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।









