জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে ছাত্রের আত্মহত্যার চেষ্টা”

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায় ১৫ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার পর আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ ও পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার আগে দীর্ঘদিন ভয়, লজ্জা ও মানসিক চাপের মধ্যে ছিল ওই কিশোর। একপর্যায়ে সে মাদ্রাসার একটি কক্ষে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে।

গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষক মাঞ্জুল হাসান চাঁদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা। তিনি দাউদকান্দির একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন বলে জানা গেছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই মাদ্রাসার আবাসিক ভবনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পাশাপাশি কক্ষে থাকতেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১৫ জুলাই রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে ওই শিক্ষার্থী নিজের কক্ষে ঘুমিয়ে ছিল। এ সময় শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন—এমন কথা বলে তাকে নিজের কক্ষে ডেকে নেন। শিক্ষার্থী সেখানে যাওয়ার পর কিছুক্ষণের মধ্যে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার পর বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য তাকে ভয় দেখানো হয়। এমনকি তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের কাছে দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ভয়ভীতির কারণে কিশোরটি পরিবারের সদস্য, সহপাঠী কিংবা অন্য কারও কাছে ঘটনাটি প্রকাশ করতে পারেনি। পরে অভিযুক্ত শিক্ষক আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করেন এবং তাকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো ও মানসিকভাবে চাপের মধ্যে রাখেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনাটি গোপন রাখতে বাধ্য হওয়ায় ওই শিক্ষার্থীর মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ তৈরি হয় বলে পরিবারের দাবি। দীর্ঘদিনের ভয়, লজ্জা, নিরাপত্তাহীনতা এবং কথিত নির্যাতনের চাপ সামলাতে না পেরে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সে মাদ্রাসার একটি কক্ষে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। বিষয়টি জানতে পেরে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তার পরিবারের সদস্যদের খবর দেয়।

খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন দ্রুত মাদ্রাসায় গিয়ে ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। তখন কান্নাজড়িত অবস্থায় সে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা পরিবারের সদস্যদের জানায়। এরপর পরিবার বিষয়টি আর গোপন না রেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

ওই শিক্ষার্থীর মা অভিযোগ করেন, ঘটনার পর থেকেই তাঁর ছেলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছিল না। শিক্ষক হুমকি দেওয়ায় সে কাউকে কিছু জানানোর সাহস পায়নি। একই সঙ্গে আবারও নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় সে আতঙ্কিত ছিল। পরিস্থিতি একপর্যায়ে অসহনীয় হয়ে ওঠায় সে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি আরও বলেন, পরিবারের সদস্যরা মাদ্রাসায় যাওয়ার পর ছেলে কাঁদতে কাঁদতে পুরো ঘটনা খুলে বলে। তাঁর অভিযোগ, সন্তানকে নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার জন্যই পরিবার আইনের আশ্রয় নিয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আনুমানিক দুইটার দিকে দাউদকান্দি মডেল থানায় মামলা করেন ওই শিক্ষার্থীর বাবা। মামলার পর পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষক মাঞ্জুল হাসানকে গ্রেপ্তার করে। দাউদকান্দি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সামছুল আলম জানিয়েছেন, মামলার পর অভিযুক্ত শিক্ষককে আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ঘটনাটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আবাসিক মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় পরিবারের বাইরে থাকায় তাদের সঙ্গে শিক্ষক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের আচরণ, আবাসিক ব্যবস্থাপনা এবং নজরদারির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কোনো শিক্ষার্থী যাতে ভয়, চাপ বা সামাজিক লজ্জার কারণে নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে না পেরে একা হয়ে না পড়ে, সে জন্য নিরাপদ ও গোপনীয় অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এলে শুধু আইনি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়; তাদের নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ভূমিকা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগকারী শিক্ষার্থীকে দোষারোপ বা সামাজিকভাবে হেয় না করে তার বক্তব্য নিরাপদ পরিবেশে শোনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

তবে মামলায় করা অভিযোগ এখনো তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে আদালতের বিচার ও প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের তদন্ত যেন নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয় এবং ভুক্তভোগী কিশোরের পরিচয় ও ব্যক্তিগত মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তাও এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আবার সামনে এসেছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর