ইরানের ওপর পরিকল্পিত সামরিক হামলা আপাতত স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং কয়েক দিনের অস্থিরতার পর অপরিশোধিত তেলের দাম সামান্য কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার কারণে গত কয়েক দিন ধরে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছিল। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ঘোষণায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে অন্যতম উচ্চ অবস্থান। তবে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামরিক অভিযান স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার পর দাম ৩ ডলার কমে ১০৯ ডলারে নেমে আসে। যদিও এই দাম এখনো স্বাভাবিক গড় দামের তুলনায় বেশ উঁচুতে অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে দ্রুত প্রভাবিত করে। কারণ এ অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস সরবরাহকেন্দ্র। ইরানকে ঘিরে সামরিক বা কূটনৈতিক সংঘাত দেখা দিলে বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয় এবং বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি মোকাবিলায় দাম বাড়িয়ে দেন।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছিল। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া যৌথ সামরিক পদক্ষেপ এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উদ্বেগ বেড়ে যায়। এর জেরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এ অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা দেখা দিলে শুধু জ্বালানির দামই বাড়বে না, একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন খরচ এবং ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতিও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো এতে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি, পরিবহন ও নিত্যপণ্যের খরচও বেড়ে যায়।
তেলের দামের সাম্প্রতিক চিত্র
| সূচক | পরিমাণ |
|---|---|
| ব্রেন্ট ক্রুডের সর্বোচ্চ দাম | ১১২ ডলার (প্রতি ব্যারেল) |
| ঘোষণার পর দাম | ১০৯ ডলার (প্রতি ব্যারেল) |
| মোট কমেছে | ৩ ডলার |
| হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন | প্রায় ২০% বৈশ্বিক জ্বালানি |
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের নজর রয়েছে মূলত দুই বিষয়ে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয় এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকে কি না। বিশ্লেষকদের ধারণা, কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি বা উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত মিললে তেলের বাজার আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
অন্যদিকে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে পরিস্থিতি আবারও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে সাময়িক স্বস্তি মিললেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এখনো অনিশ্চয়তার ছায়া থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি।
