রাজধানীতে কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ, যাত্রীবাহী বাস ও অন্যান্য যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং বিভিন্ন স্থান থেকে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই ফার্মগেট এলাকার একটি মসজিদ থেকে ২৩ জনকে আটকের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করেছে, আটক ব্যক্তিদের একটি অংশ ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামে একটি নতুন সংগঠন গড়ে খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত হওয়ার পরিকল্পনা করছিল।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে দেশে উগ্রবাদের নতুন করে বড় ধরনের উত্থান ঘটছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনও নেই। সম্ভাব্য তৎপরতা শনাক্ত ও প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরাও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, কয়েকজনকে আটক বা কিছু বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাকে ভিত্তি করে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। তবে একের পর এক বিস্ফোরণ, যানবাহনে আগুন, নতুন সংগঠন তৈরির অভিযোগ এবং বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের বিষয়গুলো অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।
ফার্মগেটের মসজিদ থেকে ২৩ জন আটক
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার একটি মসজিদ থেকে ২৩ জনকে আটক করে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযোগ, সেখানে অবস্থানরত কয়েকজন সম্ভাব্য উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করছিলেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের আটক করা হয় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আটকের পর তাদের মোবাইল ফোন পরীক্ষা এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আটক ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদে ১১ জনের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পরে ওই ১১ জনকে তাদের অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জিম্মায় দেওয়া হয়। বাকি ১২ জনকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদে ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উগ্রবাদী তৎপরতায় সংগঠিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। ঘটনাটির আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং আরও জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।
একই সময়ে রাজধানীতে একাধিক অগ্নিসংযোগ
ফার্মগেটের মসজিদ থেকে আটকের ঘটনাটির পাশাপাশি রাজধানীতে কয়েক দফা ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। শুক্রবার ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। একই সময়ে যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
পরদিন শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) মিরপুর ও মধ্য বাড্ডায় তিনটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একটি পিকআপেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের খবরও পাওয়া যায়। রোববারও ঢাকার কয়েকটি এলাকায় একই ধরনের বিস্ফোরণের খবর আসে।
এসব ঘটনার প্রতিটির মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সিদ্ধান্ত নয়
ফার্মগেটের মসজিদ থেকে আটকের বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশে উগ্রবাদ নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
তিনি বলেন, গত প্রায় দুই বছরে এ ধরনের গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড কতটা কার্যকরভাবে নজরদারির মধ্যে ছিল, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তার মতে, নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
তবে আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে তিনি সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেন। তার মতে, শুক্রবার যাদের আটক করা হয়েছে, তারা কী কারণে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি তদন্ত করছে।
নূর খান লিটন বলেন, আটক ব্যক্তিদের কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা থাকলেও তদন্তের ফল প্রকাশের আগে ঢালাও বা অনুমাননির্ভর মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
আরেক মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরও উগ্রবাদের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রমাণনির্ভর মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু শুধু গ্রেপ্তারের ওপর ভিত্তি করে দেশে উগ্রবাদ ‘মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের প্রকৃত সম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক যোগাযোগ, অর্থায়নের উৎস, অনলাইন কর্মকাণ্ড এবং সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তদন্তের মাধ্যমে তথ্য সামনে এলে পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
তার মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে যুক্তিবোধ, সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক নাগরিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করাও উগ্রবাদ প্রতিরোধের দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে বোমা
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে শুধু মসজিদ থেকে আটকের ঘটনাই নয়, বিভিন্ন স্থান থেকে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনাও রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি ‘ছাতা বোমা’ এবং আশুলিয়ায় পরিত্যক্ত একটি ব্যাগ থেকে ‘প্রেশারকুকার বোমা’ উদ্ধার করে পুলিশ।
এর আগে সাভারে একটি সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে সাভারের একটি ভাড়া বাসা থেকে একাধিক পাইপ বোমা, রাসায়নিক পদার্থ এবং বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একটি মসজিদের মাঠ থেকেও একটি শক্তিশালী প্রেশারকুকার বোমা উদ্ধার করে পুলিশ।
বরিশাল আদালত চত্বরেও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার কয়েকটির মধ্যে যোগসূত্র পাওয়ার দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সাভারের ঘটনায় জেএমবির সংশ্লিষ্টতার আলামত পাওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা। ভুয়া পরিচয়ে বাসা ভাড়া নেওয়া ব্যক্তিদের সবাইকে এখনও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং আরও একজনকে খুঁজছে সিটিটিসি।
নজরদারি অব্যাহত রাখার কথা সিটিটিসির
দেশে উগ্রবাদের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছিলেন, দেশে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দেওয়ার মতো কোনো লক্ষণ নেই। একই সঙ্গে সম্ভাব্য উগ্রবাদী তৎপরতা শনাক্ত করতে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গোয়েন্দা তথ্য এবং নিজস্ব ডেটাবেইস ব্যবহার করে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানোর কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে একাধিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত কি না, ফার্মগেট থেকে আটক ব্যক্তিদের কথিত সংগঠনের পরিকল্পনা কতটা বাস্তব ছিল এবং বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকের সঙ্গে কোনো সাংগঠনিক যোগাযোগ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।
আপাতত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজরদারি ও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। আর সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ, প্রমাণ ও তদন্তের ফল সামনে না আসা পর্যন্ত সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না যাওয়া।









