বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক চাপ ও কঠোর আইনি বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসায়িক একত্রীকরণ ও অধিগ্রহণ বা ‘মার্জার অ্যান্ড একুইজিশন’ (এমঅ্যান্ডএ) কার্যক্রমে নতুন গতি দেখা যাচ্ছে। তবে চুক্তি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে বিশ্বজুড়ে ক্রেতারা বীমা সুরক্ষাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক আইনি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘নর্টন রোজ ফুলব্রাইট’ এবং তথ্য বিশ্লেষণ সংস্থা ‘মার্জারমার্কেট’-এর বিশ্বব্যাপী এমঅ্যান্ডএ বিষয়ক যৌথ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই বছর ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকি কমানোর বিশেষ চুক্তিপত্র অর্থাৎ ‘রিপ্রেজেন্টেশন অ্যান্ড ওয়ারেন্টি’ (আরঅ্যান্ডডব্লিউ) বা ‘ওয়ারেন্টি অ্যান্ড ইনডেমনিটি’ (ডব্লিউঅ্যান্ডআই) বীমার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের তুলনায় এবার তারা চুক্তিতে বীমা সুরক্ষার ব্যবহার বাড়াবেন। এর মধ্যে ৩২ শতাংশ মনে করেন এই বৃদ্ধির হার বেশ বড় আকারের হবে। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার মতো উদীয়মান বাজারগুলোতে বীমা ব্যবহারের এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
জরিপের সার্বিক তথ্যে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী ৫২ শতাংশ ব্যবসায়ী ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে বৈশ্বিক এমঅ্যান্ডএ চুক্তি বৃদ্ধির আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। গত বছরের জরিপে যেখানে মাত্র ৩৮ শতাংশ উত্তরদাতা ইতিবাচক আশা প্রকাশ করেছিলেন, সেখান থেকে এক লাফে আস্থার এই বড় উত্থান ঘটার বিষয়টি চোখে পড়ার মতো। সীমানা ছাড়িয়ে বা আন্তঃসীমান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে প্রযুক্তি খাত আবারও শীর্ষে অবস্থান করছে। প্রায় ৬৭ শতাংশ উত্তরদাতা প্রযুক্তি খাতকে চুক্তি প্রসারের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
প্রযুক্তির বাজারের ভেতরে সবচেয়ে বড় আকর্ষণের জায়গা ধরে রেখেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭৮ শতাংশ জানিয়েছেন, এ বছর এআই খাত সবচেয়ে আকর্ষণীয় চুক্তির সুযোগ তৈরি করছে, যা গত বছর ছিল ৬০ শতাংশ। প্রায় ২৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান (যার মধ্যে প্রাইভেট ইক্যুইটি খাতের অংশগ্রহণকারী ৩৮ শতাংশ) দৈনন্দিন ব্যবসায় এআই ব্যবহার করা প্রতিষ্ঠান কেনায় মনোযোগ দিচ্ছে। এছাড়া সরাসরি এআই কেন্দ্রিক বা ‘পিওর-প্লে’ এআই কোম্পানি কেনার পরিকল্পনা করছেন ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা।
চুক্তি বাস্তবায়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে প্রাইভেট ইক্যুইটি ফান্ডগুলোর হাতে জমে থাকা বিশাল অংকের অব্যবহৃত অর্থ বা ‘ড্রাই পাউডার’। ৪৮ শতাংশ উত্তরদাতা এটিকে মূল তিনটি অনুঘটকের একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর পাশাপাশি শিল্প খাতের নিজস্ব একত্রীকরণ (৪৫ শতাংশ) এবং অলাভজনক সম্পদ বিক্রি বা ডিসপোজাল (৩৭ শতাংশ) চুক্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে ৮৬ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, আগামী দুই বছর প্রাইভেট ক্রেডিটই হবে তাদের মূল ভরসা। একই সাথে অর্ধেক ব্যবসায়ী আশা করছেন ঋণের শর্তাবলি আগের চেয়ে কিছুটা শিথিল হবে।
ভৌগোলিক দিক বিচারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বড় প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দুই অঞ্চলের জন্য যথাক্রমে ৪৮ ও ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা বড় ধরনের চুক্তি বৃদ্ধির কথা বলছেন। নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে কানাডাতেও, যেখানে ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা ইতিবাচক বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে সম্ভাবনার পাশে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রেতা ও বিক্রেতার ব্যবসায়িক মূল্যায়নের পার্থক্য বা ‘ভ্যালুয়েশন গ্যাপ’। ৪৮ শতাংশ ব্যবসায়ী এটিকে শীর্ষ তিন প্রতিবন্ধকতার একটি হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রথমবার শীর্ষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা (৩৯ শতাংশ) ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা (৩৭ শতাংশ)। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণমূলক আইনের ক্ষেত্রে একচেটিয়া বাজারবিরোধী বা ‘অ্যান্টিট্রাস্ট’ আইনকে সবচেয়ে বড় বাধা মানছেন ৩৫ শতাংশ উত্তরদাতা।
নর্টন রোজ ফুলব্রাইটের গ্লোবাল হেড অব কর্পোরেট রাজ কারিয়া মনে করেন, সাময়িক অস্থিরতার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এখন সুশৃঙ্খল ও কৌশলগত চুক্তিগুলোর পুনর্বাসন ঘটছে। ভূ-রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও এআই-এর মতো উচ্চ সম্ভাবনাময় খাতে সঠিক কৌশল ও বীমা সুরক্ষার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা আবারও বাজারে ফিরছেন, যা ২০২৬ সালে কর্পোরেট লেনদেনে বড় গতি সঞ্চার করছে।









