ছোটনাগপুর মালভূমি ও সাঁওতাল পরগনার তরঙ্গায়িত পাহাড়ি ভূমি এবং গঙ্গা-ভাগীরথী অববাহিকার বঙ্গভূমির সম্পর্ক হাজার বছরের পুরোনো ভৌগোলিক ও সামাজিক অখণ্ডতার ফসল। ২০০০ সালে তৎকালীন বিহার পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঝাড়খণ্ড পৃথক রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চলের সাথে বাংলার সীমানা ছিল চিরকালই শিথিল ও আন্তঃসম্পর্কিত। প্রাচীন কলিঙ্গ ও গৌড় রাজ্যের সীমান্তভাগ, রাজমহল ও সিংভূমের অরণ্যপথ এবং বরাকর ও দামোদর নদের অববাহিকা জুড়ে বিস্তৃত এই দুই অঞ্চলের জনমানুষের মেলবন্ধন ঘটেছে ইতিহাসের নানা বাঁকে। প্রাচীন মানভূম, সিংভূম, সাঁওতাল পরগনা এবং হাজারিবাগ অঞ্চল কেবল বাংলার ভৌগোলিক সীমান্ত ছিল না; তা ছিল বাঙালি সংস্কৃতি, ভাষা ও প্রজ্ঞার এক ঐতিহাসিক লীলাক্ষেত্র।
ঝাড়খণ্ডের সাথে বাঙালির সবচেয়ে গভীর ও আবেগঘন সম্পর্কটি গড়ে উঠেছিল উনিশ শতকে বাংলা নবজাগরণের পুরোধা ব্যক্তিত্বদের সাধনপীঠ ও স্বাস্থ্যাবাস (Sanatorium) হিসেবে এই অঞ্চলের আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে। শুষ্ক জলবায়ু ও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের টানে তৎকালীন বাংলার খ্যাতনামা পন্ডিত, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদরা ছোটনাগপুরের বিভিন্ন শহরে স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা তৈরি করেছিলেন। বিদ্যাসাগরের জীবনের শেষ দিনগুলোর নিঃশব্দ করুণা ও সাঁওতালদের সেবায় কাটানো মুহূর্তগুলো অমর হয়ে আছে সাঁওতাল পরগনার কারমাটাড়ে (বর্তমানে ‘বিদ্যাসাগর’ স্টেশন)। গিরিডিতে বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসু এবং মহাপ্রাণ পুরুষ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের দীর্ঘ অবস্থান, হাজারিবাগে রামরতন মুখোপাধ্যায় ও কেশবচন্দ্র সেনের ধর্মীয়-সামাজিক সংস্কারের স্মৃতি, দেবঘরে ঋষি অরবিন্দ ও রবীন্দ্রনাথের পৈতৃক নিবাস এবং রাঁচির মোরাবাদি পাহাড়ে (বর্তমান ‘ট্যাগোর হিল’) জ্যোতিৰিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রবীন্দ্রনাথের প্রজ্ঞাময় দিনগুলো ঝাড়খণ্ডের মাটিতে বঙ্গীয় নবজাগরণের চিরন্তন স্বাক্ষর এঁকে দিয়েছে। পরবর্তীতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী অরণ্যভিত্তিক সাহিত্য যার বড় অংশ ঘাটশিলার জঙ্গলকে ঘিরে রচিত—প্রমাণ করে যে ঝাড়খণ্ডের অরণ্য ও নদী বাঙালির রোমান্টিক মননের সাথে কীভাবে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং শিক্ষার প্রসারের দ্বিতীয় তরঙ্গে ঝাড়খণ্ডে বাঙালি ভদ্রলোক সমাজের একটি বিশাল ও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়। ব্রিটিশ আমলে ছোটনাগপুর ডিভিশন ও নন-রেগুলেটেড প্রভিন্স হিসেবে শাসিত হওয়ায় প্রশাসনিক অবকাঠামো, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা ও চিকিৎসা পরিষেবা পরিচালনার জন্য হাজারিবাগ, রাঁচি, পুরুলিয়া (তৎকালীন মানভূম), দুমকা ও চাইবাসায় বিপুল সংখ্যক বাঙালি প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট, আইনজীবী ও ডাক্তারদের সমাগম ঘটে। ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হাজারিবাগ জিলা স্কুল, ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত রাঁচি জিলা স্কুল এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে বাঙালি অধ্যাপকদের আধিপত্য ছিল অসামান্য। এই সময়ে রাঁচি, হাজারিবাগ ও দেবঘর রূপ নেয় প্রবাসী বাঙালিদের প্রধান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে, যেখানে বঙ্গীয় নাট্যচর্চা, সাহিত্য সভা এবং সঙ্গীত চর্চার এক সমৃদ্ধ আবো হাওয়া গড়ে ওঠে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে খনিজ সম্পদের বিপুল আবিষ্কার এবং আধুনিক ভারী শিল্পের প্রতিষ্ঠা ঝাড়খণ্ডে বাঙালি জনবসতির তৃতীয় ও সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটিয়েছিল। ১৯০৭ সালে জামশেদজি টাটা কর্তৃক ‘সাকচি’ গ্রামে (বর্তমান জামশেদপুর) ভারতের প্রথম বেসরকারি ইস্পাত কারখানা (TISCO) প্রতিষ্ঠিত হলে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা থেকে বিপুলসংখ্যক কারিগরি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা সেখানে যোগ দেন। পরবর্তীতে ধানবাদ, ঝরিয়া, গিরিডি ও বোকারোর কয়লা খনি শিল্প, রাঁচির ‘হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন’ (HEC) এবং বোকারো স্টিল প্ল্যান্ট গড়ে উঠলে প্রকৌশল ও খননবিদ্যায় পারদর্শী শত শত বাঙালি পরিবার সেখানে স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলেন। ফলে জামশেদপুর, ধানবাদ ও বোকারো খুব দ্রুত এক একটি আধুনিক শিল্পনগরী ও বাঙালি মধ্যবিত্তের নবীন কেন্দ্রে পরিণত হয়।
ঝাড়খণ্ডে বাঙালিদের অস্তিত্বের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিক অধ্যায়টি হলো ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ‘মানভূম ভাষা আন্দোলন’। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তৎকালীন বিহার সরকারের অধীনে থাকা মানভূম (যার কেন্দ্র ছিল পুরুলিয়া ও ধানবাদ) এবং সিংভূম অঞ্চলে বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রশাসনিক উদ্যোগ গৃহীত হলে, স্থানীয় বিশাল বাঙালি জনসংখ্যা নিজেদের মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় অভূতপূর্ব আন্দোলন শুরু করেন। লোকসেবক সংঘের নেতৃত্বে ভজহরি মাহাতো, অরুণচন্দ্র ঘোষ এবং লাবন্যপ্রভা দেবীর মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে ১৯৫৬ সালের ‘রাজ্য পুনর্গঠন আইন’-এর মাধ্যমে মানভূমের এক বিশাল অংশ পুরুলিয়া জেলা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়, যদিও ধানবাদ ও চাস বিহারের (বর্তমান ঝাড়খণ্ড) অধীনে থেকে যায়। এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে ঝাড়খণ্ডের মাটিতে বাঙালিরা কেবল পরিযায়ী চাকরিজীবী ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন সেখানকার ভূমিপুত্র ও স্বাধিকার সংগ্রামের সমান অংশীদার।
একবিংশ শতাব্দীতে স্বাধীন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের অভ্যুদয়ের পর বাঙালি সমাজ এই নবগঠিত রাজ্যের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ঝাড়খণ্ডে হিন্দি ও সাঁওতালির পাশাপাশি বাংলা ভাষা দ্বিতীয় সরকারি ভাষার (Second Official Language) মর্যাদা প্রাপ্ত হয়েছে। রাঁচির ডরান্ডা ও থরপাকনা, জামশেদপুরের সাকচি ও কদমা, ধানবাদের হীরাপুর কিংবা দেবঘরের বাঙালি পাড়াগুলোতে আজও শতবর্ষী দুর্গাপূজা, রবীন্দ্রজয়ন্তী ও কালীপূজা সাড়ম্বরে পালিত হয়। স্থানীয় আদিবাসী ও ছোটনাগপুরি জনগণের সাথে বাঙালিদের বৈবাহিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন এতই সুদৃঢ় যে, ঝাড়খণ্ডের শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে বাঙালি ব্যক্তিত্বদের প্রভাব আজও অমলিন।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ঝাড়খণ্ডে বসবাসকারী বাঙালিরা কোনো বিচ্ছিন্ন বা আধুনিককালে স্থানান্তরিত প্রবাসী সম্প্রদায় নন; তারা এই মালভূমি ও পাহাড়ি ভূখণ্ডের আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস, বনজ সংস্কৃতি, খনিজ বিপ্লব ও রাজনৈতিক রূপান্তরের এক চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সুবর্ণরেখা ও দামোদরের পলি ও পাথরে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক সীমানা যাই হোক না কেন, ছোটনাগপুরের মাটি ও বঙ্গীয় মননশীলতার এই ঐতিহাসিক সহাবস্থান চিরকাল ভারতীয় বহুত্ববাদের এক মহৎ দৃষ্টান্ত হিসেবে অক্ষুণ্ণ থাকবে।






