মধ্য ভারতের শালবৃত ঘন অরণ্যাঞ্চল, মহানদী ও গোদাবরী অববাহিকা এবং বস্তার ও ছত্তিশগড় সমভূমির অবয়ব প্রাচ্য ভারতের বঙ্গভূমির ভৌগোলিক সীমা থেকে কিছুটা দূরবর্তী মনে হলেও, ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিবর্তনের দিক থেকে এই দুটি ভূখণ্ডের আত্মিক মেলবন্ধন অত্যন্ত গভীর। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের পূর্বেও ছোটনাগপুর মালভূমির সীমান্ত পার হয়ে মধ্য ভারতের প্রাচীন রাজ্যগুলোতে বাণিজ্য, তীর্থযাত্রা ও কারিগরি সূত্রে বাঙালি জনপদের পরোক্ষ আনাগোনা ছিল। তবে আধুনিক ছত্তিশগড়ে (যা পূর্বে অখণ্ড মধ্যপ্রদেশের অংশ ছিল) বাঙালি সমাজের স্থায়ী বসতি স্থাপন, অর্থনৈতিক অবদান এবং জনমিতিক বিকাশ মূলতঃ তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—ঔপনিবেশিক রেলওয়ে ও প্রশাসনিক সম্প্রসারণ, স্বাধীনোত্তর ভারতের বৃহত্তম শিল্পায়ন উদ্যোগ (বিশেষ করে ভিলাই ইস্পাত কারখানা), এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৪৭-এর দেশভাগ-পরবর্তী বাস্তুচ্যুত বাঙালিদের ঐতিহাসিক ‘দণ্ডকারণ্য প্রকল্প’-এর মাধ্যমে পুনর্বাসন।
ছত্তিশগড়ে বাঙালি সামাজিক উপস্থিতির প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ঘটে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও পরবর্তী রাজকীয় প্রশাসন সেন্ট্রাল প্রভিন্স (Central Provinces) গঠন করে আধুনিক প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থা জোরদার করতে শুরু করে। এই সময়কালের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক অনুঘটক ছিল ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বেঙ্গল-নাগপুর রেলওয়ে’ (BNR)। হাওড়া থেকে নাগপুর ও বিলাসপুর হয়ে বিস্তৃত এই রেলওয়ে নেটওয়ার্কের প্রশাসনিক সদর দপ্তর কলকাতায় থাকার কারণে, ছত্তিশগড়ের প্রধান রেলওয়ে জংশন ও শহরগুলোতে—যেমন বিলাসপুর, রায়পুর, দুর্গ এবং রাজনান্দগাঁওয়ে—বিপুলসংখ্যক বাঙালি প্রকৌশলী, স্টেশন মাস্টার, রাজস্ব কর্মকর্তা, অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও প্রশাসনিক কর্মচারী এসে বসতি গড়ে তোলেন। বিলাসপুর রেলওয়ে ডিভিশন খুব দ্রুতই মধ্য ভারতের এক অন্যতম প্রধান বাঙালি পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা পরবর্তীতে ছত্তিশগড়ের নগর সংস্কৃতি বিকাশে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে।
ছত্তিশগড়ে বঙ্গীয় ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল, কষ্টকর অথচ গৌরবময় অধ্যায়টি সূচিত হয় ১৯৫০-এর দশকে, ভারত সরকার কর্তৃক বাস্তুচ্যুত পূর্ববঙ্গীয় শরণার্থীদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে গঠিত ‘দণ্ডকারণ্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (Dandakaranya Development Authority – DDA)-র মাধ্যমে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভিটেমাটিচ্যুত বিপুলসংখ্যক বাঙালি হিন্দু কৃষক ও শ্রমজীবী পরিবারকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য অবিভক্ত মধ্যপ্রদেশের দক্ষিণ সীমানার আদিম অরণ্যবেষ্টিত ‘বস্তার’ (Bastar) অঞ্চলকে নির্বাচন করা হয়। বর্তমান ছত্তিশগড়ের কাংকের (Kanker) জেলার ‘পারলকোট জোন’ (Paralkote Zone) ও পখঞ্জুর (Pakhanjure) অঞ্চলে হাজার হাজার বাঙালি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়। প্রতিকূল বন্য পরিবেশ, ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব, স্থানীয় ভাষার ভিন্নতা এবং অবকাঠামোগত শূন্যতাকে অতিক্রম করে এই অদম্য বাঙালি কৃষকেরা ঘন শালবন পরিষ্কার করে কৃষিজমি গড়ে তোলেন। ধান চাষ, আধুনিক সবজি উৎপাদন এবং মৎস্যচাষে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী দক্ষতা কাজে লাগিয়ে পখঞ্জুর ও সংলগ্ন এলাকাগুলোকে তাঁরা ছত্তিশগড়ের অন্যতম প্রধান কৃষি উদ্বৃত্ত অঞ্চলে পরিণত করেন। আজ পখঞ্জুর ও আশেপাশের শয়ে শয়ে গ্রামকে ছত্তিশগড়ের বুকে এক ‘লঘু বাংলা’ বা ‘Mini Bengal’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, যেখানে বাংলা ভাষা, রন্ধনশৈলী ও সামাজিক জীবনধারা অত্যন্ত প্রস্বচ্ছভাবে টিকে আছে।
স্বাধীনোত্তর ভারতে মধ্য ভারতের শিল্পায়নের যে মহামিলন ঘটেছিল, সেখানেও বাঙালি মনন ও প্রযুক্তিবিদ্যার অবদান অবিনশ্বর। ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কারিগরি সহায়তায় দুর্গ জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক ‘ভিলাই ইস্পাত কারখানা’ (Bhilai Steel Plant – BSP)। ভারতের এই আধুনিক শিল্পতীর্থ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা মেটালার্জিস্ট, মেকানিক্যাল প্রকৌশলী, রসায়নবিদ ও ভারী শিল্প বিশেষজ্ঞদের আগমন ঘটে। ভিলাই টাউনশিপ একটি সুপরিকল্পিত বহুজাতিক ও বহুভাষিক নগরী হিসেবে গড়ে উঠলেও, এর সামাজিক ও মেধাভিত্তিক বুননে বাঙালি সমাজের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত চোখে পড়ার মতো। ভিলাইয়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গবেষণা কেন্দ্র ও কারিগরি বিভাগগুলোতে বাঙালি বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও অধ্যাপকদের নিষ্ঠাপূর্ণ অবদান ছত্তিশগড়কে মধ্য ভারতের শিল্প ও মেধা রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছিল।
ছত্তিশগড়ে বসবাসকারী বাঙালি সমাজ সযত্নে ধারণ করে চলেছে নিজেদের হাজার বছরের ঐতিহ্যময় পরিচয়, একই সাথে স্থানীয় ছত্তিশগড়ি সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে এক অভূতপূর্ব সম্প্রীতির বন্ধন রচনা করেছে। রায়পুরের কালীবাড়ি ও পাইপলাইন রোড, বিলাসপুরের রেলওয়ে কলোনি, ভিলাইয়ের সেক্টর অঞ্চলসমূহ এবং কাংকের-পখঞ্জুরের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ এলাকায় অনুষ্ঠিত শত শত দুর্গাপূজা, কালীপূজা, পৌষ সংক্রান্তির নবান্ন উৎসব এবং রবীন্দ্রজয়ন্তী আজ ছত্তিশগড়ের বার্ষিক উৎসব পঞ্জিকার অংশ। বিশেষ করে পখঞ্জুরের বিস্তৃত বাঙালি জনপদে দুর্গাপূজার দিনগুলোতে পদ্মার প্লাবনভূমির সুর ও গন্ধ জেগে ওঠে শালবনের নিঃশব্দ প্রান্তরে। স্থানীয় ছত্তিশগড়ি ভাষা ও কৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং নিজেদের বাংলা ভাষার চর্চাকে অম্লান রেখে সেখানকার বাঙালিরা এক দ্বিসাংস্কৃতিক ভারসাম্যের অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন।
সব মিলিয়ে, ছত্তিশগড়ের সমাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিবৃত্তে বাঙালিরা কেবল বাধ্য হয়ে আশ্রয় নেওয়া কোনো শরণার্থী বা পেশার তাগিদে আসা পরিযায়ী সম্প্রদায় নন; বরং তাঁরা দণ্ডকারণ্যের পাথুরে ও বনময় ভূমিকে সোনা-ফলানো কৃষিক্ষেত্রে রূপান্তরিত করা কঠোর পরিশ্রমী সমাজ, বিলাসপুর ও ভিলাইয়ের শিল্প ও রেলওয়ে অবকাঠামো নির্মাণের দক্ষ রূপকার এবং মধ্য ভারতের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমলিন ও প্রজ্ঞাময় অংশীদার। শালবনের ছায়ায় মহানদী আর গঙ্গাহৃদয়ের এই ঐতিহাসিক মিলন ছত্তিশগড়ের ইতিহাসে এক চিরন্তন অধ্যায় হিসেবে ভাস্বর হয়ে আছে।






