গণঅভ্যুত্থানের সময় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে রিকশাচালক তুহিন হত্যা মামলায় পুনরায় জামিন পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে শুনানিতে অংশ নেওয়ার পর তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন বিচারক। আদালতের কার্যক্রম শেষে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন আইভী। এ সময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘জয় বাংলা, দাবিয়ে রাখা যাবে না।’
সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছান। পরে পুলিশি প্রহরায় তাঁকে আদালতকক্ষে নেওয়া হয়। এ সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক আইনজীবী, সাংবাদিক ও তাঁর সমর্থকেরা উপস্থিত ছিলেন।
শুনানিতে আইভীর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন। তিনি আদালতকে জানান, এ মামলায় পুলিশ ইতিমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তাঁর দাবি, তদন্তে বিস্ফোরকের কোনো আলামত কিংবা মামলার সঙ্গে আইভীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আইভীর আইনজীবী আরও বলেন, মামলার বাদী ও নিহত রিকশাচালক তুহিনের স্ত্রী আলেয়া আক্তার মিমকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি উপস্থিত হননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে এ মামলায় আইভী জামিন পেয়েছিলেন। তাই পুলিশের জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ এবং তাঁর মক্কেলের পুনরায় জামিন মঞ্জুরের আবেদন জানান তাঁরা।
তবে জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেন আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) জাকির হোসেন। তিনি জানান, জামিনের বিরুদ্ধে তাঁরা নারাজি পিটিশন দাখিল করবেন। এ সময় আইভীর আইনজীবী আওলাদ হোসেনসহ আসামিপক্ষের অন্য আইনজীবীরা জানতে চান, কোন আইনের ভিত্তিতে পিপি এমন আবেদন করবেন।
দুই পক্ষের বক্তব্য ও যুক্তিতর্ক শোনার পর নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আবু শামীম আজাদ আইভীর পুনরায় জামিন মঞ্জুর করেন। শুনানিতে পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন নিয়ে আসামিপক্ষের বক্তব্যও আলোচনায় আসে।
মামলার পটভূমি
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই সিদ্ধিরগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ব্র্যাক ব্যাংকের সামনে রিকশাচালক তুহিন নিহত হন। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। সেলিনা হায়াৎ আইভী এ মামলার ১১ নম্বর আসামি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত ঘটনাগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। ওই সময় বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও সহিংসতার ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। তুহিন হত্যা মামলাটিও সেই সময়ের একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হয়েছে। তবে মামলায় আসামি হিসেবে নাম থাকা অপরাধ প্রমাণের সমতুল্য নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়-দায়িত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
একইভাবে, জামিন পাওয়া মানেই মামলা থেকে অব্যাহতি বা খালাস পাওয়া নয়। জামিনের আদেশের মাধ্যমে একজন আসামি নির্ধারিত আইনি শর্তে মুক্ত থাকার সুযোগ পান। অন্যদিকে, পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার পর সেটি গ্রহণ করা হবে কি না, তা আদালতের বিবেচনার বিষয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শুনানিতে আইভীর আইনজীবী চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন; তবে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
আদালত থেকে বেরিয়ে রাজনৈতিক স্লোগান
শুনানি শেষে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় আইভী ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। পরে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘জয় বাংলা, দাবিয়ে রাখা যাবে না।’ তাঁর এই বক্তব্য আদালতের কার্যক্রম শেষে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামনে আসে।
‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুল পরিচিত একটি স্লোগান। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বক্তব্যে স্লোগানটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আদালতে হাজিরা ও জামিনের আদেশের পর আইভীর মুখে এই স্লোগান তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ হিসেবেও আলোচনায় আসতে পারে।
এদিকে, বুধবার নারায়ণগঞ্জ জেলা জজ আদালতে আইভীর আরেকটি মামলায় হাজিরার দিন ধার্য রয়েছে। ফলে পরদিনও তাঁকে আদালতের কার্যক্রমে অংশ নিতে হতে পারে। ওই মামলায় কী ধরনের শুনানি হবে বা আদালত কী সিদ্ধান্ত দেবেন, তা পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে।









