,

ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে বাড়াবাড়ি করেছে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে এখন কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, তা নির্ধারণ করাও ওয়াশিংটনের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ইরানের নেতৃত্বকে দুর্বল করার সামরিক কৌশল রাজনৈতিক সমঝোতার পথকে জটিল করে তুলেছে কি না, ট্রাম্পের বক্তব্যে সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

মঙ্গলবার (১২ অক্টোবর) ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ইয়ংসটাউনে এক নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরানের নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দূর এগিয়ে গেছে। এর ফলে এখন আলোচনার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা নেতাদের ক্ষেত্রে হয়তো অতিরিক্ত দূরে চলে গেছি, কারণ আমরা এখন আর বুঝতে পারছি না কার সঙ্গে কথা বলব।’ আলোচনার জন্য কাকে বেছে নেওয়া উচিত, তা নির্ধারণ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

তাঁর এই বক্তব্য এমন এক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের নেতৃত্বকে চাপে ফেলার চেষ্টা কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি করতে পারে। তবে ঠিক কোন পদক্ষেপের কারণে আলোচনার সম্ভাব্য অংশীদারদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট পদ নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য

জনসভায় ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানে এখন কেউই প্রেসিডেন্ট হতে চাইছেন না। তবে তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে দেশটির পরিচিত রাজনৈতিক বাস্তবতার পার্থক্য রয়েছে। মাসুদ পেজেশকিয়ান ২০২৪ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন এবং একই বছরের শেষ দিকে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে ট্রাম্পের মন্তব্যকে ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে দেখা প্রয়োজন; এটি দেশটিতে প্রেসিডেন্ট পদ শূন্য থাকার প্রমাণ নয়।

ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতেও প্রেসিডেন্টের ভূমিকা ও ক্ষমতার সীমা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ও সামরিক বিষয়ে ব্যাপক কর্তৃত্ব রাখেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট সরকার পরিচালনা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অর্থনৈতিক নীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে হলে কোন পর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে আলোচনার উপযুক্ত পক্ষ খুঁজে পাওয়ার সমস্যাটি স্পষ্ট হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য তিনি দেননি।

ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ট্রাম্পের দাবি

নিজের বক্তব্যে ট্রাম্প ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও আগের দাবির পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি বলেন, ইরান তাদের বিমানবাহিনী এবং ১৫৯টি জাহাজ হারিয়েছে। জাহাজগুলো এখন সমুদ্রের তলদেশে ‘সুন্দরভাবে বিশ্রাম নিচ্ছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ছাড়া ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর কতটা সক্ষমতা হারিয়েছে, তা মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য সামরিক তথ্য, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাই ট্রাম্পের দেওয়া সংখ্যাকে তাঁর দাবি হিসেবেই দেখা উচিত।

সামরিক অভিযানের সাফল্য তুলে ধরার পাশাপাশি আলোচনার জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব খুঁজে পেতে অসুবিধার কথা স্বীকার করায় তাঁর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য দেখা গেছে। সামরিক চাপ প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের জন্য কার্যকর যোগাযোগের পথও প্রয়োজন। সেই পথ সংকুচিত হয়ে পড়লে যুদ্ধবিরতি বা দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছানো আরও কঠিন হতে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজে হামলা নিয়ে উদ্বেগ

উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই বক্তব্য সামনে এসেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ১ অক্টোবর থেকে বাণিজ্যিক জলযানগুলোতে অন্তত ১৯টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। এ পথে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে তার প্রভাব আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে পারে।

বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার আশঙ্কা বাড়লে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিকল্প পথে চলাচল, যাত্রা পুনর্নির্ধারণ কিংবা বিমা ব্যয় বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এর ফলে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব এবং ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি দেখা দেয়। তবে সাম্প্রতিক হামলাগুলোর প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে ক্ষয়ক্ষতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সংঘাতের স্থায়িত্বের ওপর।

ইউকেএমটিওর নথিভুক্ত হামলার সংখ্যা সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মাত্রা তুলে ধরলেও, প্রতিটি ঘটনার দায় কার, তা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিশ্চিত না করে কোনো দেশকে দায়ী করা সমীচীন নয়।

সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনীতির চ্যালেঞ্জ

ট্রাম্পের বক্তব্যের তাৎপর্য কেবল ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির দাবি কিংবা নেতৃত্ব নিয়ে তাঁর মন্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়। আলোচনার জন্য উপযুক্ত পক্ষকে চিহ্নিত করতে অসুবিধার কথা স্বীকার করায় সামরিক কৌশল ও কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের মধ্যকার সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ সফল করতে হলে যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য পথ, আলোচনার গ্রহণযোগ্য কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের স্বার্থেও জরুরি।

তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বা কূটনৈতিক নীতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে, এমন কোনো নিশ্চিত ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপ, সামুদ্রিক নিরাপত্তার পরিস্থিতি এবং আলোচনার সম্ভাব্য পথ কতটা উন্মুক্ত থাকে, তার ওপরই নির্ভর করবে উত্তেজনা প্রশমনের ভবিষ্যৎ।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।