,

আলী রীয়াজের মন্তব্য, ‘সাইবার সুরক্ষা আইন নয়, সরকার সুরক্ষা আইন’

ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত জীবন, অর্থনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা, যোগাযোগ ও মতপ্রকাশের বড় একটি অংশ সাইবার জগতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে হ্যাকিং, পরিচয় চুরি, আর্থিক প্রতারণা, অনলাইন হয়রানি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোয় হামলা থেকে নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কতটা বিস্তৃত করা যাবে, তা নিয়েও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন।

সাইবার নিরাপত্তার উদ্দেশ্য কি নাগরিককে অপরাধ ও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা, নাকি সেই নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিকের স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো—বাংলাদেশে সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এই প্রশ্ন।

২৮ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজের ‘মতপ্রকাশকে সীমিত করতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন কেন’ শীর্ষক নিবন্ধে আইনটির বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাঁর আলোচনায় উঠে এসেছে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক, সরকারি ক্ষমতার সীমা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো মৌলিক বিষয়। এসব প্রশ্ন শুধু কোনো আইনের নির্দিষ্ট ধারা নিয়ে নয়; বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার ব্যবহার ও জবাবদিহির কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত।

সাইবার নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর আইন থাকা জরুরি। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, অনলাইন প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি, যৌন হয়রানি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোয় সাইবার হামলা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের জন্য গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে। এসব অপরাধের তদন্ত, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কিন্তু সাইবার অপরাধ দমন এবং নাগরিকের মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। সরকারের সমালোচনা, নীতিগত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের হাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন, পুলিশ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে, নাগরিকের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি সংবিধান, মৌলিক অধিকার এবং আইনের আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে? নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে তিনি কোথায় প্রতিকার চাইবেন? সাইবার আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে এসব প্রশ্নের কার্যকর উত্তর থাকা প্রয়োজন।

অস্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা তৈরি করতে পারে ভয়ের পরিবেশ

আইনের ভাষা এমন হওয়া উচিত, যাতে নাগরিক সহজেই বুঝতে পারেন কোন কাজ অপরাধ এবং কোনটি আইনসম্মত। ভুল তথ্য ও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এক নয়। কঠোর সমালোচনা এবং মানহানিও এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক মতবিরোধের সঙ্গে অপরাধমূলক উসকানির পার্থক্য রয়েছে। একইভাবে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আইনে এসব পার্থক্য স্পষ্ট না থাকলে তার প্রয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। কোনো বক্তব্য বা প্রকাশনা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে কি না, তা যদি অতিরিক্তভাবে প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে, তাহলে নাগরিকের মধ্যে ভীতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রস্তাবিত ২৬ নম্বর ধারা নিয়ে আলোচনার গুরুত্ব এখানেই। কোনো তথ্যকে ভুল, বিভ্রান্তিকর বা অপরাধমূলক হিসেবে বিবেচনার মানদণ্ড স্পষ্ট না হলে বৈধ সমালোচনা ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশও আইনি জটিলতার মুখে পড়তে পারে।

ভুল তথ্য শনাক্ত করা এবং মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়। তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হবে নিরপেক্ষভাবে, আর অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এবং ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া।

ভুল তথ্য নির্ধারণ করবে কে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, ব্যক্তির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জননিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই অপতথ্য প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তবে কোনো তথ্য সত্য না মিথ্যা, তা নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সরকার, পুলিশ, প্রশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা নাকি স্বাধীন বিচারিক কর্তৃপক্ষ—এ বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন।

বিশেষ করে সরকারি নীতি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। কোনো বক্তব্য সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেই সেটিকে মিথ্যা বলা যায় না। একইভাবে, কোনো প্রতিবেদন ক্ষমতাবান ব্যক্তির ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেই সেটিকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব সত্য তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিত করা, অপরাধের তদন্ত করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা। কিন্তু সত্য নির্ধারণের একচ্ছত্র ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

আশঙ্কার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন

প্রস্তাবিত ৮(২) ধারায় কোনো তথ্যের কারণে জনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, কোনো সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা কতটা নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে এবং সেই আশঙ্কার ভিত্তিতে নাগরিকের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে।

আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ আশঙ্কা যথেষ্ট ভিত্তি কি না, তা স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সম্ভাব্য ক্ষতির প্রকৃতি, তার বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের সঙ্গে ক্ষতির সম্পর্ক যাচাইয়ের সুযোগ থাকতে হবে।

সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অনেক সময় জরুরি হতে পারে। কিন্তু দ্রুততার কারণে ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্তগুলো উপেক্ষা করা যায় না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধের বিচার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তারা একই প্রক্রিয়ায় অভিযোগ, তদন্ত ও বিচারসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করলে ক্ষমতার পৃথক্‌করণ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। তাই কোন অপরাধের বিচার কীভাবে হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়ার সুযোগ পাবেন, তা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

ক্ষমতার পৃথক্‌করণ শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার তাত্ত্বিক নীতি নয়; নাগরিকের অধিকার রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সুরক্ষা।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থের সুরক্ষা

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং নাগরিকের জানার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে গিয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে। তবে জনস্বার্থে প্রমাণভিত্তিক তথ্য প্রকাশ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

আইন প্রয়োগের সময় এই পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। শুধু কোনো প্রতিবেদন ক্ষমতাবান ব্যক্তির সমালোচনা করেছে বলে সেটিকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রকাশের সুযোগও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সাংবাদিকদের ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশি ও তথ্য জব্দের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। একটি মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারে সংবাদসূত্রের পরিচয়, সাক্ষাৎকার, অপ্রকাশিত নথি, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং চলমান অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকতে পারে। এসব তথ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংগ্রহ বা প্রকাশ করা হলে সংবাদসূত্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

অবশ্য সাংবাদিক পরিচয় কাউকে বৈধ তদন্তের বাইরে রাখে না। তবে তদন্তের প্রয়োজনে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইনসম্মত ভিত্তি, প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিকতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার গোপনীয় সূত্র ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট উপাদান সুরক্ষার ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

নাগরিকের জানার অধিকার এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সাইবার নিরাপত্তার বিরোধী নয়। বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য এগুলো অপরিহার্য।

ডিজিটাল ডিভাইসে রাষ্ট্রীয় প্রবেশের সীমা

বর্তমানে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের বড় একটি অংশ ডিজিটাল ডিভাইসে সংরক্ষিত থাকে। মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারে ব্যক্তিগত ছবি, পারিবারিক যোগাযোগ, ব্যাংকিং তথ্য, ব্যবসায়িক নথি এবং ব্যক্তিগত চিন্তা ও অভিজ্ঞতার নানা উপাদান থাকতে পারে। ফলে এসব ডিভাইসে রাষ্ট্রীয় প্রবেশাধিকার শুধু তদন্তের বিষয় নয়; এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

অপরাধের তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব হতে পারে। তবে কোন তথ্য সংগ্রহ করা হবে, কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা হবে এবং কত দিন সংরক্ষণ করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার নীতি অনুসরণ করাও জরুরি। তদন্তের জন্য যতটুকু তথ্য প্রয়োজন, তার বাইরে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ বা ব্যবহার করার সুযোগ সীমিত করা উচিত। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে বিচারিক অনুমোদন, স্বাধীন তদারকি এবং তথ্যের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্দেহ তৈরি হওয়া তদন্তের কারণ হতে পারে। কিন্তু সন্দেহ নিজেই অপরাধের প্রমাণ নয়। তাই ডিজিটাল তল্লাশি ও তথ্য জব্দের ক্ষমতা যেন অযৌক্তিক নজরদারির হাতিয়ারে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

আগের আইনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা জরুরি

বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক ও অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, নতুন সাইবার আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের ক্ষেত্রে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়।

আলী রীয়াজের নিবন্ধে উদ্ধৃত গবেষণা অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে ১ হাজার ৪১৭টি মামলা হয়েছিল। এর প্রায় ৬৫ শতাংশই ছিল ৫৭ ধারার আওতায়।

অন্যদিকে, ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১ হাজার ৪৩৬টি মামলায় ৪ হাজার ৫২০ জনকে অভিযুক্ত করার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান আইনগুলোর প্রয়োগের ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে শুধু মামলার সংখ্যা দিয়ে কোনো আইনের সাফল্য বা ব্যর্থতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না। অভিযোগের ধরন, তদন্তের ফল, বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত ছিল—এসব বিষয়ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া ছাড়া নতুন আইনে পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন। তাই শুধু আইনের নাম পরিবর্তন নয়, এর ভাষা, প্রয়োগের পদ্ধতি এবং ক্ষমতার ওপর নজরদারির ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনতে হবে।

গুজব প্রতিরোধে শাস্তির পাশাপাশি প্রয়োজন স্বচ্ছতা

অপতথ্য ও গুজব মোকাবিলায় আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। তবে ফৌজদারি শাস্তিই এর একমাত্র সমাধান নয়। নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব, সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অস্পষ্টতা এবং সময়মতো তথ্য না পাওয়ার পরিস্থিতিতে গুজব ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

এ কারণে দ্রুত ও যাচাইযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন সাংবাদিকতা, পেশাদার তথ্য যাচাই এবং নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ঘটনা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে তার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।

মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে সত্য তথ্যই হতে পারে রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিরোধ। অপরাধের উপাদান প্রতিষ্ঠিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তা যেন স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রবাহের বিকল্প না হয়ে ওঠে।

তথ্যপ্রবাহ সীমিত করলেই গুজব বন্ধ হয় না। বরং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি তৈরি হলে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বাড়তে পারে। তাই কার্যকর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

সংবিধানের সীমার মধ্যেই থাকতে হবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা

সংসদ, সরকার, প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ—সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে দায়িত্ব পালন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং সংবিধান। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানই অসীম ক্ষমতার অধিকারী নয়।

সংবিধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি সেই ক্ষমতার সীমাও নির্ধারণ করে। নাগরিকের মৌলিক অধিকার, স্বাধীনতা এবং আইনের আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ রক্ষা করা রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম ভিত্তি। কোনো সাইবার আইনই এই সাংবিধানিক সীমার ঊর্ধ্বে হতে পারে না।

ডিজিটাল জগৎ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণহীন কোনো এলাকা নয়। তবে এটিকে এমন একটি পরিসর হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না, যেখানে রাষ্ট্র ইচ্ছামতো নাগরিকের যোগাযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সাইবার জগৎ মানুষের নাগরিক জীবনেরই অংশ। তাই এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

একটি গণতান্ত্রিক নিরাপত্তা আইনে তিনটি প্রশ্নের উত্তর থাকা প্রয়োজন: রাষ্ট্র কী করতে পারবে, কী করতে পারবে না এবং রাষ্ট্র নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে নাগরিক কীভাবে প্রতিকার পাবেন। এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর ছাড়া কোনো নিরাপত্তা আইনকে পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো ও ব্যবহারের সংস্কৃতি পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নাগরিকের অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা না করে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। সাইবার আইনও সেই বৃহত্তর সংস্কারপ্রক্রিয়ার বাইরে থাকতে পারে না।

নিরাপত্তার নামে নয়, নাগরিকের স্বার্থে আইন

সাইবার অপরাধ দমনের জন্য রাষ্ট্রকে কতটা ক্ষমতা দেওয়া হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে নাগরিককে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে, সেটিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বাড়বে, তার সাংবিধানিক সীমা, স্বাধীন তদারকি এবং জবাবদিহির ব্যবস্থাও তত শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নাগরিককে অপরাধ ও ক্ষতির হাত থেকে সুরক্ষা দেবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার থেকেও তাঁকে রক্ষা করবে। সরকারের সমালোচনা, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত করে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা হলে সেই নিরাপত্তার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

সাইবার সুরক্ষা আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিককে নিরাপদ রাখা, তাঁর চিন্তা ও বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা নয়। আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা থাকতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচার ও সাংবিধানিক অধিকারের সীমা অতিক্রম করা যাবে না। রাষ্ট্র শক্তিশালী হবে, তবে নাগরিকের স্বাধীনতার ঊর্ধ্বে নয়।

রাষ্ট্র জনগণের অভিভাবক নয়, সেবক। জনগণ রাষ্ট্রের জন্য নয়; রাষ্ট্র জনগণের জন্য। তাই নাগরিককে শুধু অপরাধীর হাত থেকে নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার থেকেও সুরক্ষা দেওয়া একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।