দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার জনশক্তি রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশ থেকে কর্মী গমনের হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ কমে গেছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতময় পরিস্থিতি এবং এর জেরে তৈরি হওয়া আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনার কারণেই এই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে কাজের উদ্দেশ্যে ও উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন ৫ লাখ ১৩ হাজার ৩৭ জন বাংলাদেশি। অথচ চলতি ২০২৬ সালের ঠিক একই সময়ে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৬৫ Light ৬৬৭ জনে। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এই ছয় মাসে বিদেশে কাজের সুযোগ হারিয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৭০ জন কর্মী।
Table of Contents
প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরবেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা
জনশক্তি রপ্তানি খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশের জনশক্তি বাজারের সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। বিশেষ করে সৌদি আরব এককভাবে সবচেয়ে বেশি কর্মী কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়ে থাকে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আলোচ্য ছয় মাসে কেবল সৌদি আরবেই কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৫১৯ জন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়। এই সংঘাতের জেরে সৌদি আরবসহ ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সেই সময় বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কর্মী বিমানের টিকিট কেটে এবং সব ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেও শেষ মুহূর্তে বিদেশে যেতে পারেননি। পরবর্তীতে আকাশপথ ধীরে ধীরে সচল হলেও কর্মী পাঠানোর সেই চেনা গতি আর ফিরে আসেনি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই সংঘাত চলাকালীন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে সেখানে কর্মরত ছয়জন প্রবাসী বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।
সংঘাত-পরবর্তী চার মাসে স্থবিরতা
পরিসংখ্যানের গভীরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বিশাল ঘাটতির মূল অংশটি তৈরি হয়েছে সংঘাত শুরুর ঠিক পরের মাসগুলোতে। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন—এই চার মাসে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেছেন মাত্র ২ লাখ ৪ হাজার ৯৪১ জন কর্মী। অথচ গত ২০২৫ সালের একই চার মাসে এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৪৭ জন। অর্থাৎ, সংঘাত-পরবর্তী এই চার মাসেই জনশক্তি রপ্তানি কমেছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৬ জন, যা পুরো ছয় মাসের মোট ঘাটতির প্রায় সমান।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সহসভাপতি মোহাম্মদ আবু জাফর এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সৌদি আরবের ওপর। যুদ্ধের কারণে দেশটিতে নতুন কাজের ভিসা ইস্যু করার প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এমনকি আগের অনুমোদিত অনেক ভিসাও বাতিল করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য দুবাই ও ওমানের মতো বড় দুটি শ্রমবাজারও এখনো পুরোপুরি উন্মুক্ত না হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের আশঙ্কা
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে এক ধরনের যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হলেও চূড়ান্ত কোনো শান্তি চুক্তি বা স্থায়ী স্থিতিশীলতা আসেনি। ইরানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই উত্তেজনার রেশ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এখনো বহাল রয়েছে। ফলে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে।
বায়রা নেতার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে—এমনটি বলার সময় এখনো আসেনি। যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ কেটে গিয়ে স্থায়ী শান্তি না ফিরলে এই খাতের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ফলে আগামী কয়েক মাসেও জনশক্তি রপ্তানির এই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আমদানিকারক ও রিক্রুটিং এজেন্টরা, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জনশক্তি রপ্তানির তুলনামূলক চিত্র ও পরিসংখ্যান
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের জনশক্তি রপ্তানি খাতের মূল পরিসংখ্যানগুলো নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | জনশক্তি রপ্তানি খাতের সূচক ও বিবরণ | ২০২৫ সালের চিত্র | ২০২৬ সালের চিত্র | পরিবর্তনের পরিমাণ / প্রভাব |
| ১ | জানুয়ারি-জুন (ছয় মাস) মোট কর্মী গমন | ৫,১৩,০৩৭ জন | ৩,৬৫,৬৬৭ জন | ১,৪৭,৩৭০ জন কর্মী কমেছে |
| ২ | সামগ্রিক জনশক্তি রপ্তানি হ্রাসের হার | – | – | ২৮% কমেছে |
| ৩ | মার্চ-জুন (চার মাস) মোট কর্মী গমন | ৩,৫২,৭৪৭ জন | ২,MD,৯৪১ জন | ১,৪৭,৮০৬ জন কর্মী কমেছে |
| ৪ | সৌদি আরবে কর্মী গমনের ঘাটতি | – | – | ১,৫০,৫১৯ জন কর্মী কমেছে |
| ৫ | মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু | – | – | ইরান ও আঞ্চলিক উত্তেজনা |
| ৬ | সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে নিহত প্রবাসী | – | – | ৬ জন বাংলাদেশি |
| ৭ | কর্মী গমনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা | – | – | বিমান চলাচল ব্যাহত ও ভিসা বাতিল |
| ৮ | বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ বা আংশিক শ্রমবাজার | – | – | দুবাই এবং ওমান |
| ৯ | মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি | – | – | যুদ্ধবিরতির সমঝোতা (চূড়ান্ত চুক্তি নয়) |
| ১০ | এই সংকটের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব | – | – | রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান হ্রাস |









