চীনের আবাসন খাতে বড় জালিয়াতি: ৩৪ তলার ফ্ল্যাট ভবনেই নেই

চীনে সস্তা দামে ফ্ল্যাট কেনার আশায় বিনিয়োগ করে এক ব্যক্তি ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হয়েছেন। দেশটির শানসি প্রদেশের এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে একটি বহুতল ভবনের চৌত্রিশ তলায় ফ্ল্যাট বুকিং করেছিলেন। তবে ক্রয়ের দীর্ঘ সময় পর তিনি যখন সরেজমিনে আবাসন প্রকল্পটি পরিদর্শনে যান, তখন তিনি জানতে পারেন যে ভবনটি বাস্তবে মাত্র বত্রিশ তলা বিশিষ্ট। ফলে তিনি যে ফ্ল্যাটটি নিজের জীবনের সঞ্চয় দিয়ে কিনেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছিল, বাস্তবে সেই ফ্ল্যাটের কোনো অস্তিত্বই নেই।

সস্তা মূল্যের ফাঁদ ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের চুক্তি

আবাসন খাতের এই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শেন নামের ওই ভুক্তভোগী ব্যক্তি ২০১৩ সালে চীনের শি’আনের কাছাকাছি একটি ভৌগোলিক এলাকায় একটি বহুতল আবাসিক ভবনে ফ্ল্যাট ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ওই ভবনের ৩৪তম তলায় ৯০ বর্গমিটার আয়তনের একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সম্পাদন করেন। ফ্ল্যাটটি কেনার সময় শেন লক্ষ্য করেছিলেন যে, এটি স্থানীয় সাধারণ বাজারদরের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে। সস্তায় এমন একটি ফ্ল্যাট পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি তিনি।

পরবর্তীতে জানা যায়, বাজারদরের চেয়ে এত কম দাম থাকার মূল কারণ ছিল প্রকল্পটির বিশেষ আইনি কাঠামো। আবাসন প্রকল্পটি মূলত ‘লিমিটেড প্রোপার্টি রাইটস’ বা सीमित সম্পত্তির অধিকার ব্যবস্থার অধীনে গড়ে উঠেছিল। চীনের আবাসন পরিভাষায় এই ধরণের প্রকল্পগুলো সাধারণত গ্রামীণ সমষ্টিগত জমিতে নির্মিত হয়ে থাকে। এই কাঠামোর অধীনে গড়ে ওঠা আবাসন প্রকল্পগুলোর কোনো আইনি স্বীকৃতি বা রাষ্ট্রীয় অনুমোদন থাকে না, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ধীরগতির নির্মাণকাজ এবং তলার অস্তিত্বহীনতা

উভয় পক্ষের মধ্যকার স্বাক্ষরিত মূল চুক্তি অনুযায়ী, আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ফ্ল্যাটটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে শেনের নিকট হস্তান্তর করার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ত্রুটি ও ধীরগতির কারণে প্রকল্পটি অত্যন্ত মন্থর প্রক্রিয়ায় এগোতে থাকে। এভাবে দীর্ঘ চার বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ২০১৭ সালে শেন এই আবাসন প্রকল্পের একটি চরম ও বিস্ময়কর সত্য জানতে পারেন।

তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে, সংশ্লিষ্ট বহুতল ভবনটিতে সর্বোচ্চ ৩২টি তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে এবং এর ওপর আর কোনো তলা তৈরি করার পরিকল্পনা বা অনুমোদন নেই। এই তথ্যের ভিত্তিতে শেন বুঝতে পারেন যে, তিনি যে ৩৪তম তলার ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন, দৃশ্যত এবং বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। সম্পূর্ণ অবাস্তব একটি ফ্ল্যাটের নকশা দেখিয়ে তার কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বিকল্প ফ্ল্যাটের প্রস্তাব এবং আর্থিক সংকট

প্রতারণার বিষয়টি জনসমক্ষে আসার পর এবং শেন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহিতা চাইলে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি শেনকে সান্ত্বনা দিতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভবনের ৩২তম তলায় অন্য একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করে। তবে নতুন এই ফ্ল্যাটটি বুঝে নেওয়ার জন্য শেনকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল।

ততদিনে পূর্বের বিনিয়োগ এবং দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে গভীর অর্থসংকটের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন শেন। এই তীব্র আর্থিক সংকটের কারণে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া অতিরিক্ত অর্থের শর্তযুক্ত বিকল্প প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারেননি তিনি। পরবর্তীতে শেনের আর্থিক অক্ষমতার সুযোগ নিয়ে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি ওই ৩২তম তলার ফ্ল্যাটটি অন্য একজন নতুন ক্রেতার কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করে দেয়। এর ফলে শেন তার পূর্বের ফ্ল্যাটটি যেমন হারান, তেমনি বিকল্প ফ্ল্যাট পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও সালিসি আদালতের রায়

ফ্ল্যাট ও অর্থ দুটিই হারানোর পর শেন নিজের বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য দীর্ঘ এবং জটিল এক আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেন। তিনি স্থানীয় সালিসি কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হন এবং নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানির পর সালিসি কর্তৃপক্ষ শেনের পক্ষে রায় প্রদান করে।

আদালত সংশ্লিষ্ট আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটিকে শেনের পরিশোধিত ডাউন পেমেন্টের বাকি সমস্ত অর্থ এবং এর সাথে যুক্ত হওয়া সুদসহ সর্বমোট প্রায় ৭৪ হাজার ৭০০ ইউয়ান অবিলম্বে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করে। একই সাথে আদালতের রায়ে এটিও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয় যে, যদি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শেনের এই পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের অতিরিক্ত জরিমানা এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। আদালতের এই রায়টি শেনের জন্য আইনি জয় নিয়ে এলেও বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

চীনের আবাসন খাতের বিনিয়োগের ঝুঁকি ও বর্তমান অবস্থা

আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা এবং দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও শেন এখনো তার প্রাপ্য সুদাসলের পূর্ণ পরিমাণ অর্থ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফ্ল্যাট না পাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে নিজের কষ্টের অর্থ ফেরত না পাওয়ায় তিনি বর্তমানে চরম মানসিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।

এই ঘটনাটি চীনের বর্তমান আবাসন খাতে আইনি সুরক্ষাবিহীন এবং অনুমোদনহীন গ্রামীণ সমষ্টিগত জমিতে গড়ে ওঠা প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চীনের সাধারণ মানুষের মাঝে এই ধরণের অননুমোদিত আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগের পূর্বে আইনি জটিলতা যাচাই করার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির তাগিদ দিচ্ছে এই ঘটনা। শেনের এই প্রতারিত হওয়ার গল্পটি প্রমাণ করে যে, যথাযথ আইনি দলিল ও তলা সংখ্যা যাচাই না করে সস্তায় ফ্ল্যাট কেনা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।