,

গরু ছাড়াই ‘দুধ’ তৈরি, বিপাকে প্রকৃত খামারিরা

পাবনার বিভিন্ন এলাকায় গরু ছাড়াই কৃত্রিমভাবে দুধ তৈরির অভিযোগ উঠেছে। সয়াবিন তেল, গ্লুকোজ, স্যাকারিন, ইউরিয়া সার, ডিটারজেন্ট পাউডার ও কস্টিক সোডাসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে সাদা তরল। পরে সেটিকে দুধের মতো করে বিভিন্ন চিলিং সেন্টারে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এসব চিলিং সেন্টারের মাধ্যমে সংগৃহীত দুধ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থায় ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ভেজাল দুধের কারবার শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়তে পারে বৃহত্তর ভোক্তা পর্যায়েও।

পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলায় নামে-বেনামে দুই শতাধিক চিলিং সেন্টার রয়েছে। এসব কেন্দ্র মূলত দুধ সংগ্রহ, প্রাথমিক মান যাচাই ও সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ৯২টি বিভিন্ন স্বনামধন্য কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। বাকি কেন্দ্রগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন। সাঁথিয়া, বাঘাবাড়ী ও বেড়া উপজেলাতেও রয়েছে আরও বহু চিলিং সেন্টার।

৪০ লিটারে খরচ ৪৫০ টাকা, বিক্রি ২,২০০

ভেজাল দুধ তৈরির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪০ লিটার ননিবিহীন সাদা তরলে প্রায় ৪৫০ টাকার রাসায়নিক উপাদান মেশালে সেটিকে উচ্চফ্যাটযুক্ত দুধের মতো করা যায়। পরে সেই তরল প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয় বলে তাদের দাবি।

হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ৪০ লিটারে প্রায় ১ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়। বড় পরিমাণে উৎপাদন করা গেলে এ ব্যবসা থেকে মাসে বিপুল অর্থ আয় করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, কম খরচে তৈরি হওয়ায় এই কৃত্রিম তরল প্রকৃত দুধের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। এর ফলে একদিকে ভোক্তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে খাঁটি দুধ উৎপাদনকারী কৃষক ও খামারিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অনলাইনে অর্ডারে মিলছে রাসায়নিক

কৃত্রিম দুধ তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি কারবারিরা। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ফোনে যোগাযোগ করে কিংবা অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে রাসায়নিক সংগ্রহ করা যায়। পরে কুরিয়ার বা অন্য পরিবহন ব্যবস্থায় সেগুলো সংশ্লিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

চিলিং সেন্টারে কৃত্রিম দুধ ঢোকানোর ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কারবারিদের কয়েকজনের দাবি, কখনো কখনো অর্থের বিনিময়ে সরবরাহের সুযোগ তৈরি করা হয়। এমনকি ৫০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও তারা করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট সব চিলিং সেন্টার বা দুগ্ধ কোম্পানির বিরুদ্ধে একই অভিযোগ প্রযোজ্য নয়।

একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

ভেজাল দুধ তৈরির অভিযোগে পাবনার বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনিক অভিযান ও জরিমানার ঘটনাও ঘটেছে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর বেড়ার পেচাকোলা ঘাট এলাকার উত্তম ঘোষ ও পলি ঘোষ দম্পতিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর সাঁথিয়ার নাগডেমড়া এলাকায় জুঁই ডেইরি ফার্মের মালিককে বিভিন্ন কারণে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এ ছাড়া ফরিদপুরের কেয়া ডেইরি, আমিনা ডেইরি ও প্রিমিয়াম ফুড, বেড়ার জয়দেব ঘোষ এবং ভাঙ্গুড়ার সিংগাড়ি গ্রামের আশরাফুল আলীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, বেড়ার নাকালিয়া ও পেচাকোলা বাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল দুধ তৈরির অভিযোগে জয়দেব ঘোষকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই ধরনের কারবার বন্ধ করতে শুধু জরিমানা যথেষ্ট হচ্ছে না।

খাঁটি দুধের বাজারে চাপ

ভেজাল দুধের কারবারের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে প্রকৃত খামারিদের ওপর। তাদের অভিযোগ, খাঁটি দুধ উৎপাদনে খাদ্য, শ্রম, পশু চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেশি। কিন্তু বাজারে কম দামের কৃত্রিম তরল থাকায় প্রকৃত দুধের দাম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাওইখোলা গ্রামের দুগ্ধ খামারি আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রতি লিটার ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে দুধ বিক্রি করেও অনেক সময় উৎপাদন খরচ উঠে আসে না। তার অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীরা কম দামে নকল দুধ বাজারজাত করায় প্রকৃত খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তার আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই অঞ্চলের দুগ্ধ খাত আরও সংকটে পড়বে।

সাঁথিয়ার স্থানীয় দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল লতিফের দাবি, প্রকৃত খামারিরা দুধে ভেজাল মেশান না। অতিরিক্ত লাভের আশায় কিছু অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ভেজাল দুধ সরবরাহ করেন বলে তিনি মনে করেন।

তার মতে, চিলিং সেন্টারে দুধের মান যাচাই আরও কঠোর করা প্রয়োজন। সংগ্রহের পর্যায়েই ভেজাল শনাক্ত করা গেলে পরবর্তী সরবরাহব্যবস্থায় তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ৫৫-৬০ হাজার লিটার

প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও স্থানীয় দুগ্ধ খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার লাখ লিটার দুধের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে উৎপাদন হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার।

ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার লিটার দুধের ঘাটতি থাকে। স্থানীয় সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই ঘাটতির একটি অংশ পূরণের সুযোগ নিয়েই কৃত্রিম দুধের কারবার গড়ে উঠেছে।

উৎপাদিত দুধের মধ্যে মিল্ক ভিটা প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ লিটার সংগ্রহ করে। আফতাব, আকিজ, প্রাণ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান নেয় প্রায় পৌনে দুই লাখ লিটার। পাইকাররা সংগ্রহ করেন ৫০ থেকে ৫৫ হাজার লিটার। দুই শতাধিক মিষ্টির দোকানে যায় প্রায় ১৫ হাজার লিটার এবং হাট-বাজারের স্থানীয় ক্রেতারা কেনেন প্রায় ১০ হাজার লিটার।

এই হিসাব অনুযায়ী, উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে যে ঘাটতি রয়েছে, সেটি পূরণে নিরাপদ ও বৈধ সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য

প্রাণ ডেইরির ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) সৈকত শেখ বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল সফটওয়্যার ও এলএস মেশিন ব্যবহার করে দুধ সংগ্রহ করে। নির্ধারিত মান বজায় আছে কি না তা দেখতে ১৩ থেকে ১৪টি ধাপে পরীক্ষা করা হয়। কোনো দুধে ভেজাল ধরা পড়লে তা গ্রহণ করা হয় না।

তার দাবি, ভেজাল দুধ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে গত এক বছরে তাদের চিলিং সেন্টারের চার থেকে পাঁচজন কর্মী অসাধু চক্রের হামলায় আহত হয়েছেন।

সৈকত শেখের মতে, শুধু একটি বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কৃত্রিম দুধ তৈরিতে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিকের বিপণন ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সব দুগ্ধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিন্ন মান যাচাই পদ্ধতি বা ‘ফিক্সড এসওপি’ চালু করা প্রয়োজন।

মিল্ক ভিটার অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক ডা. সাইদুল ইসলাম জানান, তাদের চিলিং সেন্টারে দুধ সংগ্রহের সময় নমুনায় ফ্যাট, এসএনএফ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। কোনো নমুনায় ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া গেলে তা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল ও ধ্বংস করা হয়।

সাধারণ পরীক্ষায় সব ভেজাল ধরা কঠিন

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, প্রাকৃতিক দুধে বিভিন্ন উপাদানের স্বাভাবিক ভারসাম্য থাকে। কৃত্রিমভাবে চর্বির মাত্রা পরিবর্তন করে দুধের কিছু বৈশিষ্ট্য নকল করা সম্ভব হলেও প্রকৃত দুধের গঠন ও পুষ্টিমান একইভাবে তৈরি করা যায় না।

তার মতে, প্রাথমিক পরীক্ষায় সব ধরনের ভেজাল শনাক্ত করা কঠিন। দুধে পানি, ইউরিয়া, ক্ষার বা ফর্মালডিহাইডের মতো উপাদান রয়েছে কি না জানতে নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরীক্ষা প্রয়োজন। এ জন্য স্বীকৃত পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা করা জরুরি।

পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদও রাসায়নিকযুক্ত দুধ নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানিয়েছেন। তার মতে, ভোজ্য তেল, ডিটারজেন্ট ও কস্টিক সোডার মতো উপাদান মিশিয়ে তৈরি তরল মানবস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও রোগীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের পণ্য গ্রহণ উদ্বেগের কারণ।

স্থায়ী ল্যাবের অভাব বড় সমস্যা

পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভেজাল দুধ প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে রাসায়নিক শনাক্ত করার জন্য আধুনিক পরীক্ষাগার প্রয়োজন, যা বর্তমানে পাবনায় নেই।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী থেকে একটি ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি মাসে মাত্র একবার আসে। ফলে সন্দেহজনক দুধের নমুনা নিয়মিত পরীক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাবনায় একটি স্থায়ী আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযান ও জরিমানার ওপর নির্ভর না করে দুধ সংগ্রহের প্রতিটি ধাপে মান যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। রাসায়নিকের বিক্রি ও পরিবহনেও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত খামারিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে ভেজাল দুধের কম দামের সঙ্গে তাদের অসম প্রতিযোগিতার চাপও কমবে।

পাবনার দুগ্ধ খাতের এই পরিস্থিতি তাই একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, ভোক্তার স্বাস্থ্য এবং কৃষকের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। চিলিং সেন্টার থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকলে সমস্যাটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।