তিন দশক পেরিয়ে গেছে। সময় বদলেছে, বদলে গেছে চলচ্চিত্রের ভাষা, দর্শকের রুচি ও বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সালমান শাহ এমন এক নাম, যার আবেদন এখনো কমেনি। মৃত্যুর ৩০ বছর পরও তার অভিনীত সিনেমার গান, সংলাপ, পোশাক, চুলের ছাঁট কিংবা পর্দায় উপস্থিতির ধরন নতুন প্রজন্মের দর্শকদের আকৃষ্ট করে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেমে যাওয়া তার জীবন যেন বাংলা চলচ্চিত্রে একটি অসমাপ্ত অধ্যায়ের নাম।
মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্রজীবনেই সালমান শাহ যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিরল। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেকের পর একের পর এক সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। ‘তুমি আমার’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘তোমাকে চাই’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র তার জনপ্রিয়তাকে আরও শক্ত ভিত্তি দেয়।
সালমান শাহর বিশেষত্ব শুধু তার চেহারা বা অভিনয় দক্ষতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তার অভিনয়ের ধরন ছিল সে সময়ের প্রচলিত নায়ক-চরিত্রের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। শহুরে তরুণের পোশাক, কথাবলার ভঙ্গি, প্রেমের প্রকাশ এবং স্বাভাবিক অভিনয় দর্শকের সামনে নতুন এক নায়ককে হাজির করেছিল। নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের তরুণ সমাজের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সময়ের প্রতিচ্ছবি।
তার পোশাক ও চুলের ছাঁটও সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। পর্দায় যে পোশাক তিনি পরতেন, অনেক তরুণ তা অনুসরণ করতেন। ফলে সালমান শাহ কেবল চলচ্চিত্রের নায়ক ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি প্রজন্মের ফ্যাশন ও সংস্কৃতির অংশ।
তার ক্যারিয়ারের সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু এই স্বল্প সময়ই তাকে অন্য অনেক নায়কের চেয়ে আলাদা অবস্থানে নিয়ে যায়। দর্শক তাকে কখনো বয়সের ভারে নুয়ে পড়তে দেখেননি। তার চলচ্চিত্রজীবন থেমে গেছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থাতেই। ফলে সময়ের সঙ্গে তার পর্দার চরিত্রগুলো পুরোনো হওয়ার বদলে অনেকের কাছে আরও বেশি স্মৃতিময় হয়ে উঠেছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় সালমান শাহকে। পরে তার মৃত্যু নিয়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। পুলিশের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও শুরু থেকেই এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন তার মা নীলা চৌধুরী। তার দাবি, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছিল।
এই দাবিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত, মামলা ও আদালতকেন্দ্রিক নানা প্রক্রিয়া চলেছে। প্রায় তিন দশক পরও তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি। চলতি বছরের জুনে মৃত্যুরহস্যের তদন্তের অংশ হিসেবে কবর থেকে সালমান শাহর দেহাবশেষ উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই আদেশ বাতিল হয়ে যায়। ফলে তার মৃত্যুকে ঘিরে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন আবারও আলোচনায় আসে।
সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য যেমন মানুষের আগ্রহ ধরে রেখেছে, তেমনি তার চলচ্চিত্রও তাকে বারবার ফিরিয়ে আনছে দর্শকের কাছে। প্রতিবছর ৬ সেপ্টেম্বর এলেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ভক্তরা তাকে স্মরণ করেন। কোথাও দোয়া ও স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার অভিনীত চলচ্চিত্রের দৃশ্য, গান ও সংলাপ।
তার ভক্তদের বিভিন্ন সংগঠনও দীর্ঘদিন ধরে সালমান শাহর স্মৃতি ধরে রাখার কাজ করে আসছে। পুরোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজনেও তার সিনেমা নিয়ে দর্শকের আগ্রহ দেখা যায়। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে বিনামূল্যে ‘তোমাকে চাই’-এর মতো চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হলে সেখানে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের উপস্থিতিও প্রমাণ করে, সালমান শাহর জনপ্রিয়তা কেবল তার সময়ের দর্শকদের মধ্যে আটকে নেই।
প্রযুক্তির পরিবর্তনও তার জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আগে যে সিনেমা দেখতে টেলিভিশন বা প্রেক্ষাগৃহের ওপর নির্ভর করতে হতো, এখন সেগুলোর গান ও দৃশ্য সহজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। পুরোনো চলচ্চিত্রের ছোট ছোট দৃশ্য নতুন করে আলোচনায় আসছে। সালমান শাহর সংলাপ ও অভিনয়ের বিভিন্ন অংশও নিয়মিত নতুন দর্শকের সামনে হাজির হচ্ছে।
নব্বইয়ের দশকের পোশাকের ধরন, চুলের ছাঁট এবং তার অভিনীত প্রেমের দৃশ্যগুলোও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে জনপ্রিয়তা পায়। যারা সালমান শাহকে জীবিত অবস্থায় দেখেননি, তাদের অনেকেই এখন তার সিনেমা ও গানের মাধ্যমে এই নায়ককে চিনছেন। অর্থাৎ একজন চলচ্চিত্র তারকার জনপ্রিয়তা কীভাবে প্রজন্ম পেরিয়ে টিকে থাকতে পারে, সালমান শাহ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তার মৃত্যুর পর তিন দশক কেটে গেলেও বাংলা চলচ্চিত্রে সালমান শাহকে ঘিরে আলোচনা থামেনি। বরং তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তার কাজের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে আরও একটি প্রজন্ম। একই সঙ্গে তার মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে অমীমাংসিত প্রশ্ন মানুষের কৌতূহলও ধরে রেখেছে।
সালমান শাহর গল্প তাই শুধু একজন জনপ্রিয় নায়কের অকালমৃত্যুর গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের স্মৃতি। এটি এমন এক শিল্পীর গল্প, যিনি খুব অল্প সময়ে দর্শকের মনে এমন ছাপ রেখে গেছেন, যা তিন দশকেও মুছে যায়নি।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইস্কাটনের সেই ঘরে থেমে গিয়েছিল একজন তরুণ অভিনেতার জীবন। কিন্তু তার চলচ্চিত্রের পর্দা নামেনি পুরোপুরি। গান, সংলাপ, চরিত্র আর দর্শকের স্মৃতিতে তিনি বারবার ফিরে আসছেন। সময় এগিয়েছে, প্রজন্ম বদলেছে—কিন্তু সালমান শাহকে ঘিরে সেই গল্পের শেষ এখনো লেখা হয়নি।










