খ্যাতি, অর্থ কিংবা কোনো ধরনের পুরস্কারের প্রত্যাশায় নয়, সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও নিবেদন থেকেই গান করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় রকশিল্পী নগরবাউল জেমস। ভক্তদের কাছে ‘গুরু’ নামে পরিচিত এই শিল্পী তরুণ সংগীতশিল্পীদের উদ্দেশে বলেছেন, সংগীতকে যদি কেবল সাফল্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, তবে তার সৃষ্টির মূল আকর্ষণই হারিয়ে যেতে পারে।
সুইডেনে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের জন্য আয়োজিত একটি концертের আগে সংবাদ সম্মেলনে নিজের সংগীতভাবনা তুলে ধরেন জেমস। সেখানে তিনি বলেন, সংগীতের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ক হওয়া উচিত আবেগ ও ভালোবাসার। কোনো প্রত্যাশা পূরণের জন্য সংগীতচর্চা করা তাঁর কাছে অর্থবহ নয়।
জেমস বলেন, “সংগীত করতে হবে শুধুই ভালোবাসা থেকে, এর প্রতি এক ধরনের আসক্তি থাকতে হবে। কেউ যদি কিছু পাওয়ার আশায় গান করে, আমি বলব—এখনই থেমে যান।”
প্রায় দুই মাস ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংগীত পরিবেশন করছেন জেমস। তাঁর এই দীর্ঘ সফরে পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, সাইপ্রাস ও ইতালিতে অনুষ্ঠান হয়েছে। ইউরোপীয় সফরের শেষ পর্বে তিনি বর্তমানে সুইডেনে রয়েছেন। সেখানকার নির্ধারিত অনুষ্ঠানটির মধ্য দিয়ে তাঁর এই দীর্ঘ ইউরোপ সফর শেষ হওয়ার কথা।
দীর্ঘ সংগীতজীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে জেমস বলেন, তিনি কখনো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে সংগীতের জগতে আসেননি। অর্থ, পরিচিতি কিংবা সাফল্যের চেয়ে সংগীতের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের ভেতরের তাগিদই তাঁকে এত বছর ধরে গান করে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।
তাঁর ভাষায়, সংগীত কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের উপায় হওয়া উচিত নয়। নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্যই গান করা উচিত। এর মাধ্যমে পরে কোনো সাফল্য বা স্বীকৃতি এলে সেটি আলাদা বিষয়। জীবনে কিছুই না পেলেও তিনি গান করে যেতেন বলে জানান।
ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ ছিল জেমসের। সেই টানেই অল্প বয়সে বাড়ি ছাড়েন তিনি। আশির দশকের শুরুর দিকে চট্টগ্রামে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডের গিটারবাদক ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর সংগীতযাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৭ সালে ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’ প্রকাশিত হয়।
পরবর্তী কয়েক দশকে জেমস বাংলাদেশের রকসংগীতের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পীতে পরিণত হন। তাঁর কণ্ঠ, গায়কির ধরন এবং মঞ্চ পরিবেশনা দেশের সংগীতাঙ্গনে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে। তাঁর গান একাধিক প্রজন্মের শ্রোতার কাছে জনপ্রিয় হয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় পেরিয়েও মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি ও শ্রোতাদের সঙ্গে সংযোগ অটুট রয়েছে।
নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ার প্রসঙ্গে জেমস বলেন, সময় কীভাবে কেটে গেছে এবং শ্রোতাদের প্রজন্ম কীভাবে বদলে গেছে, তা তিনি অনেকটা সময় খেয়ালই করেননি। এখন ফিরে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়, তিনি হয়তো একাধিক প্রজন্মের মানুষের জন্য গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
তবে বয়স ও দীর্ঘ সংগীতজীবন তাঁকে মঞ্চ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। বরং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত গান করে যেতে চান তিনি। শ্রোতার সংখ্যা নিয়েও তাঁর কোনো বিশেষ প্রত্যাশা নেই।
জেমস বলেন, শেষ পর্যন্ত যদি দর্শকসারিতে মাত্র একজন মানুষও থাকেন, তবুও তিনি সেই একজনের জন্য গান গাইবেন।
সুইডেনে ইউরোপীয় সফর শেষ করার পর জেমসের অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর নিউ সাউথ ওয়েলসে একটি বিশেষ সংগীতানুষ্ঠানে তিনি পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় রক ব্যান্ড ফসিলসের কণ্ঠশিল্পী রূপম ইসলামের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করবেন।
দীর্ঘ সংগীতজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তরুণদের প্রতি জেমসের এই বার্তা মূলত সংগীতের উদ্দেশ্য নিয়েই। তাঁর কাছে গান কেবল পেশা নয়; এটি নিজের অনুভূতি প্রকাশ, মানসিক প্রশান্তি এবং ভালোবাসার একটি পথ। সাফল্য কিংবা স্বীকৃতি পরে আসতে পারে, কিন্তু সংগীতের প্রতি আন্তরিকতাই একজন শিল্পীর পথচলার মূল শক্তি—এমন বিশ্বাসই তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের এই রকশিল্পী।










