ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অব লিজেন্ডসে শক্তিশালী ভারতকে হারিয়ে দারুণ এক জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স। শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে ব্যাট হাতে রনি তালুকদার ও আরাফাত সানির কার্যকর অবদানের পর বল হাতে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখেন এনামুল হক জুনিয়র ও আবু জায়েদ রাহি। বাংলাদেশের ১৪১ রানের সংগ্রহ তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই বিপর্যয়ে পড়ে ভারত। শেষ দিকে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় তাদের।
অল্প পুঁজির লক্ষ্য নিয়েও কীভাবে শৃঙ্খলাপূর্ণ বোলিং, কার্যকর ফিল্ডিং এবং চাপের মুহূর্তে ঠান্ডা মাথায় খেলে জয় নিশ্চিত করা যায়, সেই দৃষ্টান্তই দেখিয়েছে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স। ভারতের মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই জয় দলটির জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শারজাহতে টস জিতে প্রথমে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠান ভারতের অধিনায়ক যুবরাজ সিং। ব্যাট করতে নেমে শুরুটা ভালোই করেছিল বাংলাদেশ। প্রথম দুই ওভারে ৩০ রান তুলে আক্রমণাত্মক মেজাজের পরিচয় দেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। তবে তৃতীয় ওভারের প্রথম বলেই ৬ বলে ১০ রান করে ইমরুল কায়েস আউট হলে ছন্দপতন ঘটে। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় দলটি।
এ অবস্থায় একপ্রান্ত আগলে রেখে দলের ইনিংস এগিয়ে নেন রনি তালুকদার। ২৫ বলে ৪০ রানের ঝরঝরে ইনিংসে তিনি বাংলাদেশের রান সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে ফজলে মাহমুদ রাব্বি, জহুরুল ইসলাম ও অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ প্রত্যাশা অনুযায়ী রান করতে পারেননি। ফলে রনির বিদায়ের পর বাংলাদেশের রান তোলার গতি কমে যায়।
মাঝের ওভারে ইনিংস সামাল দেওয়ার দায়িত্ব নেন নাসির হোসেন ও আরাফাত সানি। দীর্ঘদিন পর লাল-সবুজ জার্সিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সুযোগ পেয়ে নাসির দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের পরিচয় দেন। দুটি চারের সাহায্যে ২১ বলে ২৪ রান করে তিনি দলকে আরও বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন। পীযূষ চাওলার বলে নাসিরের বিদায় ঘটলেও ততক্ষণে বাংলাদেশের ইনিংস কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে উঠেছিল।
অন্য প্রান্তে আরাফাত সানি ধৈর্যের সঙ্গে ব্যাটিং করে দলের সংগ্রহ বাড়িয়ে নেন। ৩৮ বলে তাঁর ৩৭ রানের ইনিংসটি বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান হয়ে ওঠে। তাঁর এই অবদানে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৪১ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স। ভারতের হয়ে পীযূষ চাওলা তিনটি উইকেট নেন। পবন নেগি ও ঋষি ধাওয়ান পান দুটি করে উইকেট।
১৪২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় ভারত। দলীয় রান মাত্র চার থাকতেই অম্বতি রায়ডু আউট হন। এরপর স্টুয়ার্ট বিনি ও অধিনায়ক যুবরাজ সিং দ্রুত ফিরে গেলে ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপে চাপ বাড়তে থাকে। শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের হারিয়ে ম্যাচে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পায় বাংলাদেশ।
ভারতের বিপর্যয় আরও বাড়ে পরবর্তী সময়ে। দলীয় রান ৫৫ ছোঁয়ার আগেই সাজঘরে ফেরেন রবিন উথাপ্পা ও ইউসুফ পাঠান। একের পর এক উইকেট হারিয়ে তখন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে ভারত। বাংলাদেশের বোলাররা ধারাবাহিকভাবে চাপ ধরে রাখায় প্রয়োজনীয় রান তোলার গতি বাড়াতে পারছিলেন না ভারতীয় ব্যাটাররা।
তবে ম্যাচের মাঝামাঝি সময়ে ঋষি ধাওয়ান কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৮ বলে ২৪ রান করে তিনি ভারতকে লড়াইয়ে ফেরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উইকেট নিয়ে সেই সম্ভাবনায় বাধা দেন এনামুল হক জুনিয়র। তাঁর কার্যকর স্পেল বাংলাদেশের জয়ের পথ আরও প্রশস্ত করে।
এনামুলের বোলিংয়ে ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ বারবার চাপে পড়ে। চারটি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের অন্যতম প্রধান নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি। অন্যদিকে ইরফান পাঠান ৪১ বলে ২৪ রান করলেও ভারতের প্রয়োজনীয় রান তোলার গতি বাড়াতে পারেননি। তাঁর ইনিংসটি ছিল ধীরগতির, যা লক্ষ্য তাড়ায় ভারতকে আরও চাপে ফেলে।
তবু শেষ দিকে ম্যাচের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। পবন নেগি ও পীযূষ চাওলার ব্যাটিংয়ে ভারত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও শেষ মুহূর্তের এই প্রতিরোধে ম্যাচটি কঠিন হয়ে ওঠে। অল্প রানের লক্ষ্য হওয়ায় সামান্য ভুলও বাংলাদেশের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারত।
এমন পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞতার পরিচয় দেন পেসার আবু জায়েদ রাহি। ডেথ ওভারে নিয়ন্ত্রিত বোলিং করে তিনি ভারতের ব্যাটারদের বড় শট খেলার সুযোগ সীমিত করে দেন। তাঁর বোলিংয়ে বাউন্ডারি না আসায় রান তোলার চাপ আরও বেড়ে যায় ভারতীয় দলের ওপর। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয় তারা।
বাংলাদেশের এই জয়ে ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই কয়েকজন ক্রিকেটারের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রনি তালুকদারের দ্রুত রান তোলা, নাসির হোসেনের দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং আরাফাত সানির কার্যকর ইনিংস দলকে লড়াই করার মতো সংগ্রহ এনে দেয়। এরপর এনামুল হক জুনিয়রের চার উইকেট ও আবু জায়েদ রাহির নিয়ন্ত্রিত বোলিং ভারতকে লক্ষ্য থেকে দূরে রাখে।
১৪১ রানের পুঁজি নিয়েও ভারতের মতো প্রতিপক্ষকে আটকে দেওয়া বাংলাদেশের জন্য ছিল বড় অর্জন। বিশেষ করে শেষ দিকে প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণের মুখে স্নায়ুচাপ ধরে রেখে ম্যাচ শেষ করতে পারা দলটির দৃঢ়তার পরিচয় দেয়। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্সের এই জয় টুর্নামেন্টে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি দর্শকদের জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।









