১৯ শতক ও ২০ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলিম সমাজের ঐতিহাসিক অনগ্রসরতা কোনো অকাট্য রহস্য ছিল না। অর্থনীতি, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের যেকোনো নিরপেক্ষ গবেষক একবাক্যে স্বীকার করবেন যে—বাঙালি মুসলিমদের এই পিছিয়ে পড়ার নেপথ্যে কাজ করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ নীতি, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভূমিব্যবস্থা, দেশীয় শিল্প ধ্বংসের ফলে কৃষির ওপর অতিরিক্ত চাপ, এবং সবচেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে, মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ চরম ধর্মীয় গোঁড়ামি, মোল্লাতন্ত্র ও নারী-পীড়ন।
কিন্তু আহমদ সফা তাঁর সামাজিক ও সাহিত্যিক প্রবন্ধাবলীতে, বিশেষ করে ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে, অনগ্রসরতার এই জটিল, বহুমাত্রিক ও কাঠামোগত বাস্তবতাকে পরিকল্পিতভাবে ঢেকে দিয়েছেন। তিনি অনগ্রসরতার মূল কারণ হিসেবে সামন্তীয় উৎপাদন সম্পর্ক বা অভ্যন্তরীণ সামাজিক অন্ধকারের বিচার করেননি; বরং সমস্ত দায় একপেশেভাবে চাপিয়ে দিয়েছেন একটি বাহ্যিক পরিবেশ—অর্থাৎ “হিন্দু সমাজের আধিপত্য ও বর্জননীতি”র ওপর।
১. কাঠামোগত ইতিহাস বনাম ছফীয় ব্যাখ্যা: ইতিহাস কীভাবে বিকৃত হলো?
- ঔপনিবেশিক লাখেরাজ (নিষ্কর) জমি বাজেয়াপ্তকরণ ও ব্রিটিশ নীতি: ১৮২৮ সালের পর থেকে কোম্পানি সরকার মুসলিম সামন্ত ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিষ্কর জমি (লাখেরাজ) ব্যাপকভাবে বাজেয়াপ্ত করে, যা মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যাকবোন ভেঙে দেয়।
- আশরাফ এলিটদের উর্দুপীতি ও ‘বাংলা’ ভাষাকে ঘৃণা: উর্দুভাষী বহিরাগত মুসলিম অভিজাত (আশরাফ) সমাজ বাংলাভাষী সাধারণ মুসলিমকে (আতরাফ/আজলাফ) ‘নিচু জাত’ মনে করত এবং তাদের প্রমিত বাংলায় শিক্ষা গ্রহণে বাধা দিত।
- আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে ফতোয়াবাজি: মোল্লা সমাজ ও রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতারা আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চাকে ‘কাফেরী’ ও ‘ইসলামবিনাশী’ বলে ফতোয়া দিয়ে সাধারণ মানুষকে শতাব্দীকাল অন্ধকারে বন্দী করে রেখেছিল।
“বাঙালি মুসলমানের অনগ্রসরতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, হিন্দু সমাজ তাকে নিজের লোক বলে মেনে নিতে পারেনি। হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যে আধুনিকতার চর্চা শুরু করেছিল, সেখানে বাঙালি মুসলমানের জন্য কোনো স্থান রাখা হয়নি।”
কথাটির ভয়াবহ তাত্ত্বিক রাজনীতি খেয়াল করা যাক। ব্রিটিশ সরকার যখন ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি চালাচ্ছে, আশরাফ মুসলিম জমিদাররা যখন বাংলাভাষী প্রজার রক্ত চুষছে, আর স্থানীয় মোল্লারা যখন স্কুলে যাওয়া শিশুকে ‘জাহান্নামী’ বলে ভয় দেখাচ্ছে—সফা তখন মূল আসামি বানালেন কাকে? “হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত”কে!
এটি সামাজিক বিজ্ঞানের কোনো নিরপেক্ষ অনুসন্ধান নয়; এটি হলো শোষকের প্রকৃত পরিচয় ঢেকে দিয়ে কৃত্রিম সাম্প্রদায়িক ক্ষোভ তৈরি করার চক্রান্ত।
২. অভ্যন্তরীণ অন্ধকারের ওপর প্রচ্ছদ: মোল্লাতন্ত্র ও আশরাফ শোষণের নীরব তোষণ
যেকোনো খাঁটি সামাজিক সংস্কারকের প্রধান কাজ হলো নিজের সমাজের অভ্যন্তরীণ গলদগুলো আক্রমণ করা। রামমোহন রায় থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর—হিন্দু সমাজের অভ্যন্তরীণ জাতপাত, সতীদাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন বলেই হিন্দু সমাজে আধুনিকতার সূচনা হয়েছিল। মুসলিম সমাজেও বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কিংবা কাজী আবদুল ওদুদ (বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন)-রা একই কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন। বেগম রোকেয়া পরিষ্কার ভাষায় মুসলিম সমাজের ভেতরের অবরোধপ্রথা ও ধর্মীয় ভণ্ডামিকে আক্রমণ করে লিখেছিলেন:
“আমাদের এই অধঃপতনের জন্য আমরাই দায়ী। ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও অজ্ঞতার কারণে আমরা নিজেদের ঘরের ভেতরে বন্দী করে রেখেছি।”
কিন্তু সফার কাছে এসে এই ধারালো আত্মসমালোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যায়। সফা বেগম রোকেয়া বা ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে’র সেই প্রগতিশীল আত্মবিশ্লেষণের ধারাকে স্তব্ধ করে দেন। সফা মুসলিম সমাজের চরম প্রতিক্রিয়াশীল উপাদানগুলোকে ‘ভুক্তভোগীর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া’ বলে সাফাই গেয়েছেন।
[অনগ্রসরতার প্রকৃত কারণ বনাম ছফীয় বিকৃতি]
প্রকৃত সামাজিক বাস্তবতাবাদ (রোকেয়া/আবদুল ওদুদ/বস্তুবাদী পাঠ):
[মোল্লাতন্ত্র ও আধুনিক শিক্ষারোধ] + [আশরাফদের উর্দুপীতি ও শ্রেণিশোষণ] + [নারী-পীড়ন]
= অভ্যন্তরীণ সামাজিক অনগ্রসরতা।
আহমদ সফার তাত্ত্বিক ফ্রেম (ছফামন):
[অভ্যন্তরীণ গলদকে গৌণীকরণ] + [সমস্ত দায় 'হিন্দু আধিপত্যে'র ওপর অর্পণ]
= উগ্র সাম্প্রদায়িক ভিকটিমহুড ও প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্বেষ।
“বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় গোঁড়ামি কোনো আকাশ থেকে পড়া বস্তু নয়। যখন সে দেখেছে তার চারপাশের সংস্কৃতিতে তার কোনো ঠাঁই নেই, তখন সে নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের খোলের ভেতরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।”
- অর্থাৎ, মোল্লারা যে আধুনিক শিক্ষাকে অবরুদ্ধ করেছিল, তা মোল্লাদের দোষ নয়—তা নাকি ‘হিন্দু সংস্কৃতি’র আক্রমণের প্রতিক্রিয়া!
- নারীদের যে ঘরে বন্দী রাখা হয়েছিল, তা নাকি নিজেদের ধর্মীয় সত্তা বাঁচানোর আকুল চেষ্টা!
৩. শ্রেণি-কাঠামো মুছে ফেলার ধান্দা: সামন্তবাদ বনাম সাম্প্রদায়িকতা
অনগ্রসরতার বিচারে সফার সবচেয়ে বড় দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পায় সামন্তীয় জমিদারি প্রথা বিশ্লেষণে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে যে জমিদারি ব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, সেখানে জমিদারের অর্থনৈতিক শ্রেণিচাপ প্রজার ওপর পড়েছিল। প্রজারা হিন্দু হোক বা মুসলিম, খাজনা আদায়ের চাবুক সবার পিঠেই সমানভাবে পড়ত। পাবনা কৃষক বিদ্রোহ (১৮৭৩) কিংবা তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার যুদ্ধে প্রজা-কৃষকের যৌথ অংশগ্রহণ তার ঐতিহাসিক প্রমাণ।
কিন্তু সফা কৃষক সমাজের এই যৌথ শোষণের অর্থনৈতিক সত্যকে ঢেকে দিয়েছেন। তিনি শোষকের শ্রেণি-পরিচয় মুছে দিয়ে কেবল তার ‘धर्मীয় পরিচয়’কে প্রধান করে তুলেছেন। সফার মতে, সমস্যাটি ‘সামন্তীয় জমিদারি প্রথা’ ছিল না; সমস্যা ছিল ‘জমিদারদের হিন্দু পরিচয়’!
এর ফলে মারাত্মক দুটি রাজনৈতিক অঘটন ঘটে:
১. আশরাফ মুসলিম জমিদারদের পাপ ধোয়া মুছে যায়: খাজা সলিমুল্লাহ বা ঢাকার নওয়াব পরিবার কীভাবে পূর্ব বাংলার কৃষক সমাজকে শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনা থেকে বঞ্চিত রেখে নিজেদের পারিবারিক সাম্রাজ্য গুছিয়েছিল, তা সফার কলমে ঢাকা পড়ে যায়।
২. প্রজার ক্ষোভের ভুল দিকনির্দেশনা: সাধারণ মুসলিম কৃষকের দারিদ্র্য ও অশিক্ষার জন্য দায় নির্ধারণ করা উচিত ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি ও সামন্ত কাঠামোর বিরুদ্ধে। কিন্তু সফা সেই ক্ষোভকে ঘুরিয়ে দিলেন সাধারণ হিন্দু সমাজের দিকে।
৪. প্রগতিশীল সমাজসংস্কার রুদ্ধকরণের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি
যখন কোনো চিন্তক একটি জনগোষ্ঠীকে শেখান যে—“তোমাদের সকল দুঃখ, কষ্ট, অনগ্রসরতা ও অশিক্ষার জন্য তোমরা নিজেদের কোনো ভুলের জন্য দায়ী নও; এর জন্য দায়ী অন্য একটি সম্প্রদায়, অন্য একটি ধর্ম বা বাইরের কোনো ষড়যন্ত্র”—তখন সেই জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মসংস্কারের আর কোনো তাগিদ থাকে না।
সফা ঠিক এই কাজটাই করেছেন। তিনি বাঙালি মুসলিমকে কোনো আত্মসমালোচনার আয়নার সামনে দাঁড় করাননি; বরং তাদের হাতে একটি ‘অভিযোগপত্র’ তুলে দিয়েছেন।
এই একপেশে ব্যাখ্যার রাজনৈতিক পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ:
- এটি মুসলিম সমাজের ভেতরের প্রগতিশীল সংস্কার আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
- এটি শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা ও সেক্যুলার মূল্যবোধকে “হিন্দুদের বিষয়” বলে বর্জন করার একটি প্রচ্ছন্ন মানস তৈরি করেছে।
- এটি তৈরি করেছে এক চিরন্তন ‘ঐতিহাসিক ক্ষোভের মনস্তত্ত্ব’ (Resentment Psychology), যা কেবল রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার ইন্ধন জোগায়।
অনগ্রসরতার প্রচ্ছদে উগ্র ডানপন্থার বীজরোপণ
আহমদ সফার অনগ্রসরতা সংক্রান্ত এই একপেশে বিশ্লেষণ কোনো নির্দোষ ভুল নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট পরিচয়বাদী রাজনৈতিক প্রজেক্ট। তিনি যদি সত্যিই প্রগতিশীল হতেন, তবে তিনি ঔপনিবেশিক শাসন, অভ্যন্তরীণ মোল্লাতন্ত্র এবং আশরাফ শ্রেণিশোষণের বিরুদ্ধে তীব্র আঘাত হানতেন। কিন্তু তিনি আঘাত হানলেন অখণ্ড অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের মূল সম্ভাবনার ওপর।
সফা অনগ্রসরতার বাহ্যিক রূপকে দেখিয়ে সমাজ-কাঠামোর মূল শোষকদের আড়াল করেছেন এবং সমস্ত ক্ষোভকে চালিত করেছেন অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে।
আর এই কারণেই, আজকের বাংলাদেশে যারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ অপরাধ, ধর্মান্ধতা, দুর্নীতি ও কূপমণ্ডূকতা ঢাকতে পরম উৎসাহে “হিন্দু চক্রান্ত”, “ভারতের চক্রান্ত” কিংবা “সেক্যুলারদের চক্রান্ত” বলে চিৎকার করে—তাদের সবচেয়ে প্রিয় তাত্ত্বিক গুরু হলেন আহমদ সফা। সফা তাদের শিখিয়ে গেছেন—কীভাবে নিজের ঘরের অন্ধকার না মুছে, প্রতিবেশীর আলোর ওপর দোষ চাপিয়ে উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হয়।







