পকেট খরচের টাকা জোগাড় করতে মাত্র চার মাস বয়সী আপন ভাগ্নেকে একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার মামার বিরুদ্ধে। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে এ ঘটনায় জিয়ারুল ইসলাম (২১) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিশুটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে জিয়ারুল ইসলামকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে রোববার (৪ অক্টোবর) রাতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে পার্বতীপুর মডেল থানা-পুলিশ।
গ্রেফতার জিয়ারুল ইসলাম পার্বতীপুর উপজেলার চন্দ্রপুর হাফেজপাড়া এলাকার মনোয়ার ইসলামের ছেলে। উদ্ধার হওয়া শিশুটির নাম মাহিম ইসলাম আনাস। সে দিনাজপুর সদর উপজেলার নেমতারা গ্রামের আল আমিন ইসলাম ও মনিরা বেগম দম্পতির সন্তান।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি চার মাসের সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ি পার্বতীপুর উপজেলার চন্দ্রপুর হাফেজপাড়ায় বেড়াতে যান শিশুটির মা মনিরা বেগম। সেখানে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে শিশুটিও অবস্থান করছিল।
গত শনিবার (৩ অক্টোবর) দিবাগত রাতে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়ার পর জিয়ারুল গোপনে শিশুটিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে শিশুটিকে একটি মানব পাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার কথা পুলিশকে জানিয়েছে সে।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানায় শিশুটিকে দেখতে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বাড়ির আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান না পাওয়ায় বিষয়টি দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়। পরে শিশুটির বাবা-মা পার্বতীপুর মডেল থানায় অভিযোগ করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ শিশুটির সন্ধানে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে রোববার রাতে অভিযান চালিয়ে জিয়ারুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে শিশুটিকে বিক্রি করার কথিত স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় শিশুটিকে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর তাকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল ওয়াদুদ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জিয়ারুল শিশুটিকে ৬০ হাজার টাকায় একটি চক্রের কাছে বিক্রি করার কথা স্বীকার করেছে। তার দাবি, নিজের পকেট খরচের টাকা জোগাড় করার উদ্দেশ্যেই সে এ কাজ করে। তবে বিক্রির পুরো টাকা সে হাতে পায়নি বলে পুলিশকে জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের ঘটনাটি তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। শিশুটিকে কীভাবে ওই চক্রের কাছে পৌঁছানো হয়েছিল এবং এর সঙ্গে আর কারা যুক্ত ছিল, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ঘটনায় শিশুটির বাবা আল আমিন ইসলাম বাদী হয়ে মানব পাচার আইনে পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন। মামলায় জিয়ারুল ছাড়াও কথিত চক্রের অন্য সদস্যদের নাম রয়েছে। তাদের অবস্থান শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
শিশুটিকে দ্রুত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া গেলেও ঘটনায় জড়িতদের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুলিশ বলছে, শিশুটিকে কারা গ্রহণ করেছিল, অর্থ লেনদেনে কারা যুক্ত ছিল এবং চক্রটি আরও কোনো শিশুকে এভাবে পাচারের চেষ্টা করেছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
মাত্র চার মাস বয়সী একটি শিশুকে অর্থের বিনিময়ে অন্যের কাছে তুলে দেওয়ার অভিযোগে ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।









