খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৩৪ পিএম

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে প্রস্তুতি ম্যাচেই বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের বড় দুর্বলতা সামনে এসেছে। ডারউইনের মারারা ওভালে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে তিন দিনের ম্যাচে ইনিংস ও ৩৮ রানে হেরেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। প্রথম ইনিংসে ২৬৩ রান করে কিছুটা লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিলেও দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। ফলে ম্যাচের শুরুতে পাওয়া ঘাটতি পূরণ করার সুযোগও তৈরি হয়নি।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তিনি সেঞ্চুরি করে দলের স্কোরকে সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যান। তবে তাঁর বাইরে আর কোনো ব্যাটসম্যান পঞ্চাশের ঘরে পৌঁছাতে পারেননি। ব্যক্তিগতভাবে মিরাজের ইনিংসটি আশাব্যঞ্জক হলেও দলীয় ব্যাটিংয়ে বড় জুটি কিংবা দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকার মতো ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি।
বাংলাদেশের ২৬৩ রানের জবাবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ ৩৫৫ রান করে। এতে প্রথম ইনিংসেই ৯২ রানের লিড পায় তারা। টেস্ট ম্যাচের আবহে প্রস্তুতি নেওয়া বাংলাদেশের জন্য এই ঘাটতি খুব বড় না হলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়াতে হলে ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন ছিল।
দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ২ উইকেটে ১৯ রান। হাতে ছিল আরও আট উইকেট। তাই শেষ দিনে প্রতিরোধ গড়ে ম্যাচে ফেরার বাস্তব সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনা দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। তৃতীয় দিনের শুরুতে মাত্র ১৭ ওভারের মধ্যে বাকি আট উইকেট হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। একের পর এক ব্যাটসম্যান সাজঘরে ফেরায় স্কোরবোর্ডে রান যোগ হওয়ার বদলে উইকেটের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস থামে মাত্র ৫৪ রানে। অর্থাৎ প্রথম ইনিংসে পিছিয়ে থাকা ৯২ রানও তুলতে পারেনি দল। দ্বিতীয় ইনিংসে প্রতিপক্ষের প্রথম ইনিংসের লিডের অর্ধেকেরও কম রান করেছে বাংলাদেশ। এত দ্রুত একটি ইনিংস শেষ হয়ে যাওয়া দলের ব্যাটিংয়ের গভীরতা ও চাপ সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের ব্যাটিং ধসের প্রধান কারিগর ছিলেন বাঁহাতি পেসার ক্যাম্পবেল থম্পসন। তিনি একাই বাংলাদেশের ১০টি উইকেটের আটটি তুলে নেন। বাকি দুটি উইকেট যায় অফ স্পিনার কোরি রকিচোলির ঝুলিতে। বিশেষ করে থম্পসনের বোলিংয়ের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের প্রতিরোধ ছিল অত্যন্ত দুর্বল।
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন ওপেনার তানজিদ হাসান। আগের দিন অপরাজিত থাকা তানজিদ ৪১ বল খেলে ২২ রান করেন। তাঁর পর আর কোনো ব্যাটসম্যান দুই অঙ্কের রান করতে পারেননি। মেহেদী হাসান মিরাজ ১৯ বলে করেন মাত্র ৬ রান। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন, তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন কোনো রান না করেই আউট হন। ফলে বাংলাদেশের ইনিংসের শেষদিকে ব্যাটিং বিপর্যয় আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
থম্পসনের পারফরম্যান্সের আরেকটি দিক বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। মাত্র ২২ বছর বয়সী এই বাঁহাতি পেসারের এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়নি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর অভিজ্ঞতাও ছিল সীমিত। মাত্র দুটি ম্যাচ খেলে তিনি উইকেট পেয়েছিলেন তিনটি। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও দুটি ম্যাচে তাঁর উইকেট ছিল একটি। এমন সীমিত অভিজ্ঞতার একজন বোলারের সামনে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যাটিং ইউনিটের এমন আত্মসমর্পণ প্রস্তুতি ম্যাচের ফলাফলের বাইরে গিয়ে দলটির জন্য সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
তবে প্রস্তুতি ম্যাচের ফল দিয়ে পুরো টেস্ট সিরিজের সম্ভাব্য চিত্র নির্ধারণ করা যায় না। দলের মূল উদ্দেশ্য থাকে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি যাচাই করা এবং সিরিজের আগে দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করা। সেই দিক থেকে মারারা ওভালের ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে নতুন বলের গতি, বাউন্স ও পেস সামলানো বরাবরই সফরকারী দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সামনে তাই শুধু টেকনিক্যাল দক্ষতার পরীক্ষা নয়, দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার পরীক্ষাও অপেক্ষা করছে। প্রথম ইনিংসে মিরাজের সেঞ্চুরি দলের জন্য ইতিবাচক দিক তৈরি করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৪ রানের ধস দেখিয়েছে, একজন বা দুজন ব্যাটসম্যানের ওপর নির্ভর করে টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন।
বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রথম টেস্ট শুরু হবে ১৩ আগস্ট ডারউইনে। এরপর ২২ আগস্ট ম্যাকাইয়ে শুরু হবে দ্বিতীয় টেস্ট। মূল সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ও গতিময় পেস আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার আগে মারারা ওভালের ব্যাটিং ধস তাই বাংলাদেশের জন্য বড় সতর্কসংকেত।
বিশেষ করে টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডারকে দ্রুত নিজেদের ভুলগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। অফ-স্টাম্পের বাইরের বল সামলানো, শরীরের কাছাকাছি বাউন্সার মোকাবিলা, নতুন বলের প্রথম দিকের চাপ কাটিয়ে ওঠা এবং উইকেটে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার মানসিকতা—এসব জায়গায় উন্নতি করা জরুরি। প্রস্তুতি ম্যাচে জয়-পরাজয় শেষ কথা নয়; কিন্তু কোন জায়গায় সমস্যা রয়েছে, সেটি স্পষ্ট করে দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন ম্যাচের মূল্য অনেক।
মারারা ওভালের ম্যাচে বাংলাদেশ সেই দুর্বলতাই খুব পরিষ্কারভাবে দেখতে পেয়েছে। এখন সিরিজ শুরুর আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই ব্যাটিং ভঙ্গুরতা কাটিয়ে কতটা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে দলটি।
মন্তব্য