,

হুতি হামলার আতঙ্কে প্রাসাদ বদলাচ্ছেন সৌদি যুবরাজ

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তাঁকে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে এক রাজপ্রাসাদ থেকে অন্য রাজপ্রাসাদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে বাংকার-সুবিধাসম্পন্ন একাধিক প্রাসাদকে সম্ভাব্য আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একের পর এক হামলার ঘটনায় দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে চাপে পড়েছে। বিশেষ করে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে চালানো হামলা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। হামলার তীব্রতা, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ এবং আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তারের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে সৌদি নেতৃত্বের সামনে এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

জনসমক্ষে অনুপস্থিত যুবরাজ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ মঙ্গলবার একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর থেকে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ায় যুবরাজের সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁকে জনদৃষ্টির আড়ালে রেখে বাছাই করা দক্ষ নিরাপত্তাকর্মীদের একটি দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।

যুবরাজের অবস্থান পরিবর্তনের এই পদক্ষেপকে চলমান নিরাপত্তাঝুঁকির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তির শীর্ষ নেতৃত্বকে নিরাপদে রাখার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সামরিক নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও তা জড়িত।

তবে যুবরাজের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া মেলেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রিয়াদ বিমানবন্দরে বারবার হামলা

কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমান যোগাযোগকেন্দ্র। রাজধানী রিয়াদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রক্ষা এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে বিমানবন্দরটির বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে এটিকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালানোয় দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ দিনের মধ্যে বিমানবন্দরটিতে চারবার হামলা চালানো হয়েছে। গত সপ্তাহান্তের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। হুতি বিদ্রোহীদের এক মুখপাত্র হামলার দায় স্বীকার করে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে তাঁদের আক্রমণ অব্যাহত থাকবে।

বিমান চলাচলবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, এই অচলাবস্থার কারণে রিয়াদ বিমানবন্দরের নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৬০ শতাংশ বাতিল করতে হচ্ছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে যাত্রীদের ভ্রমণসূচি, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং পণ্য পরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিমানবন্দরের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি সৌদি আরবের

হুতি বিদ্রোহীদের হামলার জবাবে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান বলেছেন, হামলার ভয়াবহতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশটির প্রতিক্রিয়াও কঠোর হবে। তাঁর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, রিয়াদ হামলাগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা ঘটনা হিসেবে দেখছে না; বরং দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছে।

তবে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের মাত্রা এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করতে পারে হামলার ধরন, ক্ষয়ক্ষতি এবং মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।

এদিকে সৌদি কর্মকর্তারা গোপনে স্বীকার করেছেন, ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে। শত্রুপক্ষের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস করতে এসব প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে এগুলোর পর্যাপ্ত মজুত বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ

আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সৌদি আরব গত মাসে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, চলমান হামলা মোকাবিলায় রিয়াদ এককভাবে নিজের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে চাইছে না; বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা জোরদারের চেষ্টা করছে।

তবে সহায়তার অনুরোধের পর কোন দেশ কী ধরনের সামরিক সরঞ্জাম বা সক্ষমতা সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে সৌদি আরবকে সহায়তা দেওয়ার প্রশ্নটি ওয়াশিংটনের জন্যও সামরিক সরঞ্জামের প্রাপ্যতা ও কৌশলগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নেবে কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে। সৌদি আরবের মিত্রদেশগুলোও দেশটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়নি।

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি থেকে নতুন সংঘাত

ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সমঝোতা সংঘাতের তীব্রতা কমাতে ভূমিকা রাখলেও দুই পক্ষের বিরোধ পুরোপুরি মেটাতে পারেনি। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওই যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ে। ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দর থেকে হুতি প্রতিনিধিদের নিয়ে তেহরানগামী একটি ইরানি উড়োজাহাজ উড্ডয়নের চেষ্টা করলে সৌদি বাহিনী গুলি চালায় বলে অভিযোগ তোলে হুতিরা। এরপরই নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ঘটনার অভিযোগ ও পাল্টা অবস্থান সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে নেই। ফলে সংঘাতের সূচনা এবং বিভিন্ন পক্ষের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের সংঘাত এখন আর শুধু ইয়েমেনের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকিতে নেই। বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ এবং সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অংশগ্রহণ—সবকিছুই সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে একাধিক সুরক্ষিত প্রাসাদে সরিয়ে নেওয়ার খবর সৌদি নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন। তবে তাঁর প্রকৃত নিরাপত্তাঝুঁকির মাত্রা, স্থানান্তরের নির্দিষ্ট কারণ এবং ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপ সম্পর্কে সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হওয়া কঠিন।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।