বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যাঁদের সাহসী ভূমিকা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন তাঁদের অন্যতম। ভাষার দাবিতে আন্দোলনকে সংগঠিত করা, ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে নামার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘ভাষা মতিন’ নামে।
১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের চৌহালি উপজেলার ধুবালীয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল মতিন। তাঁর বাবা আবদুল জলিল এবং মা আমেনা খাতুন। শৈশব থেকেই মেধা, সাহস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মানসিকতা তাঁর চরিত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ পরবর্তী জীবনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি দ্রুত রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে চলে আসে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর একটি অংশ উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নিলে পূর্ববাংলার মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আবদুল মতিন তখন তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে প্রতিবাদে যুক্ত হন। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই তিনি সক্রিয় ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্য দিলে আবদুল মতিন প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেন। সেই প্রতিবাদ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম পরিচায়ক হয়ে ওঠে।
ভাষার দাবিকে একটি সুসংগঠিত আন্দোলনে পরিণত করতে আবদুল মতিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কর্মপরিষদের সঙ্গেও তিনি যুক্ত হন। তাঁর নেতৃত্বে ছাত্রসমাজের মধ্যে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে।
১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন আবারও ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণার পর পূর্ববাংলায় প্রতিবাদের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। ছাত্রসমাজের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং ভাষার দাবিতে আন্দোলন নতুন গতি পায়।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ সংঘাত এড়াতে ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু ছাত্রনেতাদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে রাজি ছিলেন না।
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্রসভায় আবদুল মতিন ও গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত ছাত্ররা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিল নিয়ে রাজপথে বেরিয়ে আসেন। মিছিলটি এগিয়ে গেলে পুলিশ গুলি চালায়।
পুলিশের গুলিতে রফিক, জব্বার, বরকতসহ কয়েকজন প্রাণ হারান। পরে সালামসহ আরও কয়েকজন আহত অবস্থায় মারা যান। তাঁদের রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়। সেই ঘটনা ভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে।
একুশের আত্মত্যাগের তাৎপর্য ছিল বহুমাত্রিক। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবির মধ্য দিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নও সামনে চলে আসে। পরবর্তী সময়ে স্বাধিকার আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা গঠনে ভাষা আন্দোলনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভাষা আন্দোলনের পরও আবদুল মতিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে যায়নি। ১৯৫২ সালের এপ্রিল মাসে ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের দ্বিতীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি বামপন্থী রাজনীতি ও বিভিন্ন গণআন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে কারাবরণ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের মতো নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবু নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আদর্শ থেকে তিনি সরে যাননি।
শুধু রাজনীতিবিদ হিসেবেই নয়, লেখক ও চিন্তাবিদ হিসেবেও আবদুল মতিনের পরিচিতি ছিল। ভাষা আন্দোলন, বাঙালির জাতিসত্তা, ইতিহাস এবং সমাজ-রাজনীতি নিয়ে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘ভাষা ও একুশের আন্দোলন’, ‘ভাষা আন্দোলন কি এবং তাতে কি ছিল’, ‘ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য’—আহমদ রফিকের সঙ্গে যৌথভাবে লেখা—‘বাঙালি জাতির উৎস সন্ধান ও ভাষা আন্দোলন’ এবং ‘জীবন পথের বাঁকে বাঁকে’।
ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০১ সালে আবদুল মতিন একুশে পদকে ভূষিত হন। ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লজ ডিগ্রি প্রদান করে।
জীবনের শেষ অধ্যায়েও মানবিকতার দৃষ্টান্ত রেখে যান তিনি। মৃত্যুর পর তাঁর চোখ ও দেহ দানের ইচ্ছা তিনি বাস্তবায়ন করেন। তাঁর দান করা কর্নিয়ায় একজন মানুষ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গ করা এই ভাষাসৈনিক মৃত্যুর পরও মানুষের উপকারে নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন।
২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৭ বছর বয়সে মারা যান আবদুল মতিন। তাঁর মৃত্যুতে একটি বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটে। কিন্তু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছে।
বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার যে আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা কেবল একটি ভাষার স্বীকৃতির দাবি ছিল না। এটি ধীরে ধীরে বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর সংগ্রামের ভিত্তি তৈরি করে। সেই ইতিহাসে আবদুল মতিনের নাম তাই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
ভাষার জন্য রাজপথে দাঁড়িয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার যে সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজও নতুন প্রজন্মের কাছে সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা। তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়—মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার সঙ্গেও তা গভীরভাবে যুক্ত।
মৃত্যুর এক যুগ পরও ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের স্মৃতি তাই অম্লান। একুশের রক্তাক্ত পথের এই নির্ভীক যোদ্ধার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে একই সঙ্গে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামকেও স্মরণ করা।









