১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও বাংলা ব্যবচ্ছেদ ছিল আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি, সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং বর্ণহিন্দু জমিদার-অভিজাত শ্রেণির স্বার্থরক্ষার ঘাতক মিশ্রণে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং যৌথ বঙ্গীয় সংস্কৃতির ব্যবচ্ছেদ ঘটেছিল। সেক্যুলার ও প্রগতিশীল ইতিহাসচর্চা ১৯৪৭-কে একটি কৃত্রিম, সাম্প্রদায়িক ও সামন্তীয় ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করে—যা সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করে শোষণের পথ উন্মুক্ত করেছিল।
কিন্তু আহমদ ছফা যখন ১৯৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলন ও দেশভাগের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন, তখন তিনি এই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল কোণ থেকে জাস্টিফাই করেন। ছফা ১৯৪৭-এর রক্তক্ষয়ী দেশভাগকে সাম্প্রদায়িক বিপর্যয় হিসেবে দেখার বদলে একে “বাঙালি মুসলমানের অনিবার্য সামাজিক মুক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার” হিসেবে তত্ত্বায়িত করেছেন। এর মাধ্যমে ছফা প্রগতির প্রচ্ছদ পরে মূলত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বিভাজনমূলক ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ (Two-Nation Theory)-কেই নতুন মোড়কে বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দান করেছেন। এই পর্বের মূল ময়নাতদন্ত হলো: কীভাবে ছফামন পাকিস্তান আন্দোলনকে শ্রেণি বা সেক্যুলার মুক্তির রূপ না দিয়ে উগ্র ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবাদের সাফাই গেয়েছে এবং জিন্নাহর সাম্প্রদায়িক দর্শনের সাথে গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মীয়তা গড়ে তুলেছে।
১. ১৯৪৭-এর রক্তঝরা ট্র্যাজেডি বনাম ছফীয় ‘আত্মনিয়ন্ত্রণে’র রাজনৈতিক সাফাই
সেক্যুলার ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন, ১৯৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলন মূলত মুসলিম নবাব, জমিদার ও উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণির ক্ষমতা দখলের লড়াই ছিল, যার শিকার হয়েছিল সাধারণ হিন্দু-মুসলিম কৃষিজীবী মানুষ। অথচ ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ এবং ‘সেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ’-এ এই ইতিহাসকে উল্টে দিয়ে দাবি করেন যে, ১৯৪৭ ছিল বাঙালি মুসলিম কৃষকের “প্রাকৃতিক মুক্তিদিন”।
“বাঙালি মুসলমানের পাকিস্তান আন্দোলন কেবল জিন্নাহর উসকানিমূলক রাজনীতির ফল ছিল না; তা ছিল এই ভূখণ্ডের বর্ণহিন্দু জমিদার, মহাজন ও মধ্যবিত্তের অবহেলা ও শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের কৃষক ও উদীয়মান মুসলিম মধ্যবিত্তের শতবছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আত্মপ্রকাশ। ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ না হলে বাঙালি মুসলমান কোনোদিন অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত না।”
এই যুক্তির তাত্ত্বিক অসাধুতা ও চতুর প্রতিক্রিয়াশীলতা উন্মোচন করা জরুরি:
- সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে ‘শ্রেণি মুক্তি’ হিসেবে চালানো: ইস্টবেঙ্গল বেঙ্গল এস্টেটস অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট (১৯৫০) বা ভূমিসংস্কারকে ছফা দেখেন কেবল “মুসলিমদের মুক্তি” হিসেবে। কিন্তু জমিদারি প্রথার বিলোপ একটি সেক্যুলার আর্থ-সামাজিক সংস্কার ছিল; তার জন্য একটি যৌথ দেশকে ধর্মের ভিত্তিতে খণ্ড-বিখণ্ড করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে রিফ্যুজি বানানোর প্রয়োজন ছিল না।
- গরিব হিন্দু ও নমশূদ্রদের ইতিহাস মুছে ফেলা: ছফা চিত্রায়িত করেছেন যেন সব হিন্দু ছিল শোষণকারী জমিদার আর সব মুসলিম ছিল শোষিত প্রজা! অথচ পূর্ববঙ্গের কোটি কোটি নিম্নবর্ণের হিন্দু (নমশূদ্র, রাজবংশী) মুসলিম কৃষকের মতোই একই সামন্তীয় শোষণের শিকার ছিল। ছফা এই অসাম্প্রদায়িক কৃষিজোটকে অদৃশ্য করে সামন্তীয় শোষণকে একটি উগ্র “হিন্দু বনাম মুসলিম” সাম্প্রদায়িক যুদ্ধে রূপান্তর করেছেন।
২. জিন্নাহর ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ বনাম ছফীয় ‘বাঙালি মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদ’: বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মীয়তা
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দাবি করেছিলেন যে—হিন্দু ও মুসলিম দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতীয় সত্তা, যাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও উৎস এক হতে পারে না।
আহমদ ছফা সেক্যুলার বা মার্সবাদী পোশাক পরে ঠিক একই জিন্নাহীয় তাত্ত্বিক কাঠামোর পুনরাবৃত্তি করেছেন। নিচে দুটি দর্শনের কাঠামোগত সমান্তরালতা দেখানো হলো:
[দ্বিজাতিতাত্ত্বিক দর্শনের দুই সংস্করণ]
│
┌───────────────────────────────┴───────────────────────────────┐
▼ ▼
[জিন্নাহর রাজনৈতিক দ্বিজাতিতত্ত্ব (১৯৪০)] [ছফীয় সাংস্কৃতিক দ্বিজাতিতত্ত্ব (১৯৮১)]
• হিন্দু ও মুসলিম দুটি আলাদা রাজনৈতিক জাতি • বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলিম দুটি আলাদা সাংস্কৃতিক সত্তা
• যৌথ ভারতে মুসলিমদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব অসম্ভব • যৌথ অখণ্ড বাংলায় বাঙালি মুসলিমের সাংস্কৃতিক আত্মবিকাশ অসম্ভব
• সমাধান: ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র নির্মাণ • সমাধান: ১৯৪৭-এর বিভাজনকে 'অনিবার্য আত্মনিয়ন্ত্রণ' বলে জাস্টিফাই করা
*ফলাফল:* রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সাম্প্রদায়িকীকরণ *ফলাফল:* সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়াশীলতা ও উগ্র স্বাতন্ত্র্যবাদ
“বাঙালি হিন্দু এবং বাঙালি মুসলমানের যৌথ সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায়, তা একধরনের অলীক কল্পনামাত্র। তাদের ধর্ম আলাদা, জীবনের আকাক্সক্ষা আলাদা, এমনকি তাদের ভাষার উৎস ও রূপকল্পও আলাদা। পাকিস্তান আন্দোলন বাঙালি মুসলমানকে এই ঐতিহাসিক সত্য অনুধাবন করতে শিখিয়েছিল।”
এখানে ছফা ও জিন্নাহর চিন্তার মধ্যে কোনো গুণগত পার্থক্য অবশিষ্ট থাকে না। জিন্নাহ রাজনীতির ময়দানে যে সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষ রোপণ করেছিলেন, ছফা সাহিত্যের ও সংস্কৃতির ময়দানে সেই বিষবৃক্ষকেই “বাঙালি মুসলিমের নিজস্ব পরিচয়” বলে পানি সিঞ্চন করেছেন।
৩. ১৯৭১-কে ১৯৪৭-এর ‘অসমাপ্ত কাজের ধারাবাহিকতা’ বানানোর ঐতিহাসিক অসাধুতা
ছফার এই ১৯৪৭-তোষণ তত্ত্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে।
১৯৭১ ছিল মূলত ১৯৪৭-এর ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্ব, পাকিস্তান নামক কৃত্রিম রাষ্ট্রকাঠামো এবং ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত অকার্যকারিতার অসাম্প্রদায়িক ঘোষণা। বাঙালি জাতি ১৯৭১-এ রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছিল যে—ধর্মের ভিত্তিতে কোনো আধুনিক জাতিরাষ্ট্র হতে পারে না; ভাষা, সংস্কৃতি ও সেক্যুলার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।
কিন্তু ছফা ১৯৭১-কে দ্বিজাতিতত্ত্বের পরাজয় হিসেবে দেখতে অস্বীকৃতি জানান! তিনি এক নতুন কুযুক্তি খাড়া করেন, যা অনুযায়ী ১৯৭১ নাকি কোনো অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন ছিল না, বরং ১৯৭১ ছিল “১৯৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলনেরই আসল ও অসমাপ্ত স্বপ্নপূরণ”!
ছফা ‘রাজনীতি ও সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে লিখছেন:
“১৯৪৭ সালে বাঙালি মুসলমান যে স্বতন্ত্র আবাসভূমির স্বপ্ন দেখেছিল, জিন্নাহ ও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা তা বিশ্বাস করেছিল। ১৯৭১ সালে বাঙালি মুসলমান সেই ভুল শুধরে নিয়ে নিজের প্রকৃত স্বতন্ত্র ‘মুসলিম বাংলা’ প্রতিষ্ঠা করেছে।”
এই বয়ানের চতুর রাজনৈতিক কৌশলটি লক্ষ্য করুন:
১. সেক্যুলারিজমকে বর্জন: ছফা মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি—ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে বাদ দিয়ে ১৯৭১-কে কেবল “মুসলিম ভূখণ্ডের নতুন পুনর্বিন্যাস” বানিয়ে দিলেন।
২. পাকিস্তানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলদের পুনর্বাসন: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভুল ধারণাকে সঠিক প্রমাণ করতে গিয়ে ছফা দেখালেন যে, পাকিস্তান তৈরি করা ভুল ছিল না, ভুল ছিল কেবল পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসন করা! এর মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানপন্থীদের হাতে এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্র তুলে দিলেন।
৪. বর্তমান বাংলাদেশে ছফীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের পুনরুত্থান
আজকের বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে যে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়, তার বুদ্ধিবৃত্তিক অক্সিজেন জোগায় এই “ছফীয় ১৯৪৭-পাঠ”।
- দেশভাগকে উদ্যাপন: যখন বাংলাদেশের একদল তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ১৯৪৭-এর দেশভাগকে “বাঙালি মুসলিমের স্বাধীনতার দিন” হিসেবে উদ্যাপন করতে চায় এবং ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য রবীন্দ্রনাথ ও সেক্যুলার নেতাদের গালি দেয়;
- মুক্তিযুদ্ধকে অসম্পূর্ণ ঘোষণা: যখন তারা দাবি করে যে ১৯৭১-এর মূল কাজ ছিল “পাকিস্তানকে পরিশুদ্ধ করে এক নতুন স্বাধীন মুসলিম বাংলা তৈরি করা”, অসাম্প্রদায়িক সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠন করা নয়;
- সহাবস্থানকে ঘৃণা করা: এবং যখন তারা সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে উগ্র ‘মুসলিম-বাংলাদেশি’ পরিচয় চাপিয়ে দিতে চায়—
তখন তারা হুবহু আহমদ ছফার লেখা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ এবং ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ থেকে তাদের বক্তব্যের তাত্ত্বিক প্রমাণ উদ্ধার করে।
প্রগতির মুখোশ খুলে ফেলার আহ্বান
আহমদ ছফা নিজেকে একজন প্রগতিশীল, বিদ্রোহী ও স্বাধীন চিন্তক হিসেবে উপস্থাপন করতে পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু তাঁর ইতিহাসচিন্তার গভীরে উঁকি দিলে দেখা যায়—তিনি মূলত ১৯৪৭-এর রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দেশভাগ ও জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বেরই এক চতুর সাহিত্যিক আইনজীবী।
যেকোনো সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক সমাজের কাজ হলো ১৯৪৭-এর সাম্প্রদায়িক দেশভাগের ক্ষত থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি যৌথ, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু আহমদ ছফা জাতিকে সেই প্রগতির দিকে না নিয়ে, আবার ১৯৪৭-এর সেই পুরনো উগ্র দ্বিজাতিতাত্ত্বিক গহ্বরে ফেরত পাঠাতে চেয়েছেন। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সেক্যুলার ও মানবিক চেতনাকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তবে প্রগতির রূপ ধারণ করা আহমদ ছফার এই ‘দ্বিজাতিতাত্ত্বিক সাফাই’ ও ‘পাকিস্তানপন্থী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য’কে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে।







