,

হরিয়ানায় বাঙালি জনবসতি, শিল্প-অভিযাত্রা ও মননশীল ঐতিহ্যের ইতিহাস

উত্তর ভারতের ঐতিহ্যবাহী যমুনা অববাহিকা ও বৈদিক সভ্যতার লালনভূমি হরিয়ানা এবং প্রাচ্য ভারতের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র প্লাবনভূমির বঙ্গপ্রদেশ—এই দুই ভূখণ্ডের ঐতিহাসিক সম্পর্ক কোনো সাম্প্রতিক প্রপঞ্চ নয়। প্রাচীন আর্যাবর্তের উত্তরপথ (Grand Trunk Road) ধরে যে বাণিজ্য, সামরিক অভিযান এবং ধর্মীয় কফেলা বঙ্গদেশ থেকে উত্তর ভারতের হৃদয়ে পরিচালিত হতো, তা হরিয়ানার কুরুক্ষেত্র, কার্নাল ও পানিপথের সমভূমিকে স্পর্শ করে গিয়েছে। মহাভারতের পুণ্যভূমি কুরুক্ষেত্র থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক আমলের অম্বালা ক্যানটনমেন্ট, ১৯৪৭-পরবর্তী পুনর্বাসন এবং একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি নগরী গুরুগ্রাম (গুরুগাঁও)—এই দীর্ঘ সময়সীমা জুড়ে হরিয়ানার ভৌগোলিক ও সামাজিক বুননে বঙ্গীয় মনন ও শ্রমের ঐতিহাসিক ছাপ অত্যন্ত স্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ।

হরিয়ানার মাটিতে বঙ্গীয় সংস্কৃতির প্রাচীনতম ও গভীর অধ্যাত্ম-সংযোগটি সূচিত হয় ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর উত্তর ভারত ভ্রমণের মাধ্যমে। প্রবাদ ও ঐতিহাসিক আখ্যান অনুযায়ী, ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে শ্রীচৈতন্য যখন প্রখ্যাত তীর্থক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে পদার্পণ করেন, তখন থেকেই বৈষ্ণব দর্শনের নতুন এক অধ্যায় সূচিত হয়। ব্রজধাম ও বৃন্দাবনের মতো কুরুক্ষেত্রের বুকে শ্রীকৃষ্ণের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে গৌড়ীয় বৈষ্ণব পণ্ডিত ও সন্ন্যাসীদের পদচারণা নিয়মিত হয়ে ওঠে। পরবর্তী শতকগুলোতে বঙ্গদেশের সন্ন্যাসী, দর্শনার্থী ও শাস্ত্রবিদরা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে হরিয়ানার কুরুক্ষেত্র, পেহোয়া এবং জিন্দ অঞ্চলে যাত্রা করেন, যা উত্তর ভারতীয় হিন্দু মানসিকতা ও বঙ্গীয় ভক্তি আন্দোলনের মধ্যে এক সুপ্রাচীন প্রজ্ঞাময় আত্মিক সেতু গড়ে তোলে।

উনিশ শতকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনিক সম্প্রসারণ এবং বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ ও উত্তর ভারতে রেলওয়ে সংযোগ চালুর মাধ্যমে হরিয়ানায় আধুনিক বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের (ভদ্রলোক শ্রেণী) দ্বিতীয় ও সুসংগঠিত অভিযাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন ঔপনিবেশিক প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা এবং আম্বালা সামরিক ঘাটি (Ambala Cantonment) পরিচালনা করার জন্য বিপুলসংখ্যক বাঙালি আইনজীবী, বিচারক, চিকিৎসক, স্টেশন মাস্টার এবং পোস্টাল কর্মকর্তা অম্বালা, কার্নাল এবং পানিপথে স্থায়ী ও অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। অম্বালা ক্যানটনমেন্ট দ্রুত উত্তর ভারতের অন্যতম প্রধান সামরিক ও সামাজিক কেন্দ্রে পরিণত হলে সেখানকার সিভিল সার্ভিস দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা অসামান্য ভূমিকা রাখেন, যা স্থানীয় হরিয়ানভি সমাজের সাথে আধুনিক ইউরোপীয় ও বঙ্গীয় শিক্ষার মেলবন্ধন ঘটায়।

১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক দেশভাগ এবং পরবর্তী ১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তান সঙ্কটের সময় বাস্তুচ্যুত বাঙালি হিন্দু শরণার্থীদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে হরিয়ানার জনমিতি ও কৃষিব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন সূচিত হয়। ভারত সরকার পরিচালিত পুনর্বাসন নীতির অংশ হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত কৃষক পরিবারকে হরিয়ানার কার্নাল, কুরুক্ষেত্র, আম্বালা, হিসার এবং ‘নীলোখেড়ি’ (Nilokheri Project) অঞ্চলে কৃষিজমি ও বসতি প্রদান করা হয়। এই কঠোর পরিশ্রমী বাঙালি কৃষকরা হরিয়ানার স্থানীয় কৃষকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। নিচু জঙ্গল ও জলাভূমি পরিষ্কার করে ধান চাষে বঙ্গীয় অভিজ্ঞতার প্রয়োগ ঘটিয়ে হরিয়ানার কার্নাল-কুরুক্ষেত্র বেল্টকে ভারতের অন্যতম প্রধান ‘রাইস বোল’ বা ধান উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তরে তারা বিশেষ অবদান রাখেন।

কৃষির পাশাপাশি স্বাধীনোত্তর হরিয়ানার শিল্পায়নেও বাঙালি কারিগর ও প্রকৌশলীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গভীর। ১৯৫০-এর দশকে নতুন দিল্লিতে স্থানান্তরিত শরণার্থীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্য নিয়ে হরিয়ানার সীমান্তে যে নতুন শিল্পনগরী ‘ফরিদাবাদ’ (Faridabad Industrial Township) গড়ে তোলা হয়, তার নির্মাণ ও শিল্পায়নে বিপুলসংখ্যক বাঙালি প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও কারখানার শ্রমিক অবদান রাখেন। একই সাথে যমুনানগরের পেপার ও টাইম্বার মিল, পানিপথের টেক্সটাইল শিল্প এবং আম্বালার সায়েন্টিফিক ইন্সট্রুমেন্ট শিল্পে বাঙালি বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা প্রশংসিত হয়। এছাড়া, অবিভক্ত মেদিনীপুর ও হুগলী জেলা থেকে আসা অত্যন্ত দক্ষ স্বর্ণশিল্পীরা ফরিদাবাদ, আম্বালা ও গুরুগ্রামের অলংকার শিল্পে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে হরিয়ানায় বাঙালি জনবসতি এক অভূতপূর্ব ও বিশ্বায়িত মাত্রা লাভ করে, যার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে গুরুগ্রাম (Gurugram/Gurgaon)। নব্বইয়ের দশকের পর গুরুগ্রাম যখন একটি অনাবাদী প্রান্তর থেকে ভারতের প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি (IT), ফিনটেক ও বহুজাতিক কর্পোরেট হাব হিসেবে গড়ে ওঠে, তখন পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার তরুণ বাঙালি প্রযুক্তিবিদ, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, গবেষক, চিকিৎসক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গুরুগ্রামে আগমন করেন। গুরুগ্রামের সাইবার সিটি, ডিএলএফ ফেইজ ১ থেকে ৫, সোহনা রোড এবং গল্ফ কোর্স রোডের বিস্তৃত উপশহরগুলোতে আজ লক্ষাধিক বাঙালি পেশাজীবীর সুসংগঠিত ও সক্রিয় উপস্থিতি বিদ্যমান।

আজকের হরিয়ানায় বসবাসকারী বাঙালি সমাজ কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সফল নয়; তারা হরিয়ানার বুকে বঙ্গীয় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সযত্নে টিকিয়ে রেখেছে। গুরুগ্রামের ‘গুরুগাঁও কালীবাড়ি’, ‘বঙ্গীয় পরিষদ’, ডিএলএফ ফেইজের বিখ্যাত দুর্গাপূজাগুলো, ফরিদাবাদ ও অম্বালার শতবর্ষী পূজা উৎসবগুলো আজ সমগ্র জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের (NCR) অন্যতম প্রধান সামাজিক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। শরৎকালে একদিকে যখন হরিয়ানার গ্রামীণ জনপদে লোকউৎসব ও কুস্তির আখড়ার হাঁকডাক চলে, অন্যদিকে গুরুগ্রাম ও ফরিদাবাদের মণ্ডপে মণ্ডপে ধ্বনিত হয় ঢাকের শব্দ ও রবীন্দ্রসঙ্গীত। বহু প্রজন্ম ধরে হরিয়ানায় বসবাসকারী বাঙালিরা যেমন স্থানীয় কন্নড়-হরিয়ানভি কথ্য রূপ, অতিথিপরায়ণতা ও জীবনযাত্রাকে আপন করে নিয়েছেন, তেমনি স্থানীয় হরিয়ানভি সমাজও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক মেধা ও প্রজ্ঞাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করেছে। কুরুক্ষেত্রের প্রাচীন ইতিহাস থেকে শুরু করে আধুনিক গুরুগ্রামের আন্তর্জাতিক সীমানা পর্যন্ত হরিয়ানার অগ্রগতি ও বিবর্তনের প্রতিটি পাতায় বঙ্গীয় শ্রম, মেধা ও সংস্কৃতির এই অম্লান ছাপ এক চিরন্তন ইতিহাস হয়ে বিরাজ করছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।