‘এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’—এই গানটির সঙ্গে নির্মলা মিশ্রের নাম এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, গানটি উচ্চারিত হলেই তাঁর মায়াময় কণ্ঠ যেন কানে ভেসে আসে। তাঁর আরও বহু গান কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার আবেগের অংশ হয়ে আছে। ২০২২ সালের ৩১ জুলাই তাঁর জীবনাবসানের পরও সেই গানগুলোর আবেদন ফুরোয়নি।
সংগীতের আবহেই বেড়ে ওঠা
১৯৩৮ সালের ২ অক্টোবর দক্ষিণ ২৪ পরগনার মজিলপুরে নির্মলা মিশ্রের জন্ম। তাঁর বাবা পণ্ডিত মোহিনীমোহন মিশ্র ছিলেন সংগীতজ্ঞ; মা ভবানী দেবী। বাবার চাকরিসূত্রে পরবর্তী সময়ে তাঁদের পরিবার কলকাতার চেতলায় বসতি গড়ে। ফলে নির্মলার শৈশব কেটেছে এমন এক পরিবেশে, যেখানে সংগীত ছিল প্রতিদিনের জীবনেরই অংশ।
পরিবারের সংগীতচর্চার প্রভাব তাঁর ওপর ছোটবেলাতেই পড়ে। পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, তিনি বাবার কাছেই উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম শুরু করেছিলেন। শৈশবে টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে উচ্চাঙ্গ সংগীতের অনুশীলনে বাধা এলেও গান থেকে তিনি দূরে সরে থাকেননি। পরে আধুনিক বাংলা গানের চর্চাও শুরু করেন। তাঁর প্রথম রেকর্ড প্রকাশের সময়কাল ১৯৫৭ বলে পারিবারিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
চেতলার এই শিল্পীর ডাকনাম ছিল ‘ঝামেলা’। পরিবারের মানুষ ও ঘনিষ্ঠজনেরা স্নেহ করে তাঁকে ‘ঝামেলাদি’ বলতেন। ডাকনামটির মধ্যে যেমন ছিল তাঁর স্বভাবের একটি দিকের ইঙ্গিত, তেমনি ছিল আপনজনদের গভীর স্নেহ।
নেপথ্য কণ্ঠ থেকে জনপ্রিয়তার শিখরে
ষাটের দশকের শুরুতে চলচ্চিত্রের নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর পেশাদার সংগীতজীবনের বিস্তার ঘটে। ১৯৬০ সালে বালকৃষ্ণ দাসের সংগীত পরিচালনায় ‘শ্রী লোকনাথ’ চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ দেওয়ার কথা বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর বাংলা আধুনিক গান ও চলচ্চিত্রের গানে তাঁর উপস্থিতি ক্রমেই দৃঢ় হয়।
‘এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’, ‘সেই একজন দিও না তাকে মন’, ‘আবেশে মুখ রেখে’, ‘বলো তো আরশি’, ‘আমি তো তোমার হাসি কান্নার চিরদিনের সাথী’, ‘কাগজের ফুল বলে’, ‘ও তোতা পাখি রে’—এমন অসংখ্য গান তাঁর কণ্ঠকে শ্রোতাদের কাছে আলাদা পরিচিতি দেয়।
‘ও তোতা পাখি রে’ গানটির সঙ্গেও তাঁর নিজের একটি স্মৃতি জড়িয়ে ছিল। পরিবারের সদস্যের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, আকাশবাণীতে পূরবী দত্তের কণ্ঠে গানটি শুনে নির্মলা মিশ্র গানটি রেকর্ড করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। পরে গানটি তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড হয় এবং জনপ্রিয়তা পায়।
তাঁর কণ্ঠে ‘এই বাংলার মাটিতে’ গানটিও শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুরুতে গানটির রেকর্ডিং নিয়ে জটিলতা তৈরি হলেও পরে তা নতুনভাবে রেকর্ড করা হয় বলে পারিবারিক স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে।
শুধু বাংলা নয়, ওড়িয়া গানেও উজ্জ্বল পরিচয়
নির্মলা মিশ্রের শিল্পীসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ওড়িয়া সংগীত ও চলচ্চিত্র। ওড়িয়া ছবিতে তাঁর গাওয়া গান তাঁকে সেখানকার শ্রোতাদের কাছেও বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলে। ‘নিদাভরা রাতি মধুঝরা জানহা’ এবং ‘মো মনা বীণার তারে’র মতো গান ওড়িয়া সংগীতের শ্রোতাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি অসমিয়া গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন।
২০১১ সালের এক সাক্ষাৎকারে নির্মলা মিশ্র নিজেই জানিয়েছিলেন, অসমিয়া গান গাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বাংলা হরফে কথা লিখে নিয়ে কয়েকবার অনুশীলন করতেন। ‘সবুজ পাহাড় ডাকে’ গানটিও অসমিয়া গানের বাংলা রূপান্তর থেকে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
ওড়িয়া সংগীতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিও মিলেছে। আজীবন অবদানের জন্য তিনি ‘সঙ্গীত সুধাকর বালকৃষ্ণ দাস পুরস্কার’ পান। ওড়িয়া চলচ্চিত্রের গানেও তাঁর আলাদা অবস্থান তৈরি হয়েছিল।
গানের পরিসর ছিল আরও বিস্তৃত
নির্মলা মিশ্রকে শুধু আধুনিক বাংলা গানের শিল্পী হিসেবে দেখলে তাঁর সংগীতজীবনের ব্যাপ্তি পুরোপুরি ধরা পড়ে না। তিনি নজরুলগীতি, শ্যামাসংগীত, দেশাত্মবোধক গান, লোকগীতি ও অন্যান্য ধারার গানও গেয়েছেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তাঁর একাধিক একক অ্যালবামও প্রকাশিত হয়েছিল।
বাংলা গানের বহু বিশিষ্ট শিল্পীর সঙ্গেও তাঁর কণ্ঠের যুগলবন্দি হয়েছে। মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়সহ সমসাময়িক অনেক খ্যাতিমান শিল্পীর সঙ্গে তাঁর গান শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। একই সময়ে তিনি নিজের কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্যও অটুট রেখেছিলেন।
১৯৭৬ সালে উত্তম কুমারের মহালয়া গীতিনাট্যে তাঁর অংশগ্রহণও তাঁর শিল্পীজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয়।
পুরস্কার-সম্মানেও স্বীকৃতি
দীর্ঘ সংগীতজীবনে নির্মলা মিশ্র পেয়েছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ২০১২ সালে ‘সঙ্গীতসম্মান’ এবং ২০১৩ সালে ‘সঙ্গীত মহাসম্মান’ ও ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রদান করে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তিনি সম্মানসূচক ডক্টরেট লাভ করেন বলে তাঁর পরিবারের স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে।
তবে শিল্পীর সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি সম্ভবত পুরস্কারের তালিকায় নয়। সেটি শ্রোতাদের স্মৃতিতে টিকে থাকা। নির্মলা মিশ্র সেই স্বীকৃতি জীবদ্দশাতেই পেয়েছিলেন।
শেষ অধ্যায়
জীবনের শেষ কয়েক বছর নানা শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে কাটিয়েছেন নির্মলা মিশ্র। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকার পর ২০২২ সালের ৩০ জুলাই রাতে চেতলার নিজ বাড়িতে তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। পরদিন রবীন্দ্রসদনে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান অনুরাগী ও শিল্পীমহলের মানুষজন; পরে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
তাঁর প্রয়াণে বাংলা ও ওড়িয়া সংগীতজগতে শোক নেমে আসে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে নির্মলা মিশ্রের দীর্ঘ সংগীতজীবন ও জনপ্রিয় গানগুলোর কথা স্মরণ করেন।
আজ তাঁর কণ্ঠ আর নতুন কোনো গান উপহার দেয় না। কিন্তু শিল্পীর চলে যাওয়া মানেই তাঁর সৃষ্টির সমাপ্তি নয়। বরং অনেক সময় মৃত্যুর পরই একটি শিল্পী নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন করে আবিষ্কৃত হন।
নির্মলা মিশ্রের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে, পুরোনো দিনের স্মৃতির ভেতর, কিংবা নিঃশব্দ কোনো রাতে তাঁর গান হঠাৎ ভেসে উঠলে মনে হয়—এই কণ্ঠ যেন এখনও খুব কাছে আছে। ‘এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’ শুধু একটি জনপ্রিয় গান নয়; এটি বহু মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক সংগীত-অনুভূতি।
ঝিনুকের ভেতরে মুক্তো পাওয়া গেল কি না, সেটি হয়তো সবসময় গুরুত্বপূর্ণ নয়। কখনো সেই ঝিনুকের গায়ে লেগে থাকে সমুদ্রের গন্ধ, ঢেউয়ের স্মৃতি আর অগণিত গল্প। নির্মলা মিশ্রের গানও তেমন—প্রতিটি সুরে রেখে গেছে এক একটি সময়, এক একটি অনুভূতি, এক একটি মানুষের নিজস্ব স্মৃতি।
তাই তাঁর পার্থিব কণ্ঠ থেমে গেলেও সুর থামেনি। গান থেকে গেছেন, শ্রোতার স্মৃতিতেও থেকে গেছেন নির্মলা মিশ্র।
বাংলা গানের সেই মায়াময় কণ্ঠকে তাই আজও স্মরণ করা যায় একই আবেগে—শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় এবং তাঁর অমলিন সুরের কাছে ফিরে গিয়ে।









