,

কালীগঙ্গার নৌকাবাইচে চ্যাম্পিয়ন কুড়িগ্রামের ‘মায়ের দোয়া’

মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীতে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ঘিরে শনিবার (৩ অক্টোবর) উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। বিকেলে জেলাশহরের বেউথা ঘাট এলাকায় আয়োজিত এই প্রতিযোগিতা দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন কয়েক লাখ মানুষ। নানা বয়সী দর্শকের উপস্থিতিতে নদী ও আশপাশের এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। প্রতিযোগিতায় চারটি শ্রেণিতে ২২টি নৌকা অংশ নেয়। শেষ পর্যন্ত খেল্লা নৌকা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ‘মায়ের দোয়া’।

জেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এই নৌকাবাইচে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও কুড়িগ্রামের রৌমারী, টাঙ্গাইলের নাগরপুর এবং পাবনার সাঁথিয়া থেকে প্রতিযোগীরা অংশ নেন। খেল্লা-গয়ইটা, ঘাসি-ছিপা, ছান্দি ও পানসি—এই চার ধরনের নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। নৌকার পাশাপাশি ৭০ ও ৮০ হাত দীর্ঘ দুটি কলাগাছের ভেলাও বাইচে অংশ নেয়। ঐতিহ্যবাহী নৌযানের বৈচিত্র্য এবং প্রতিযোগীদের দক্ষতা দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করে।

খেল্লা নৌকা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে ‘মায়ের দোয়া’। পুরস্কার হিসেবে নৌকাটির দল পায় একটি ১০০ সিসি মোটরসাইকেল। একই বিভাগে রানার্সআপ হয় টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ‘মা-বাবার দোয়া’। তাদের দেওয়া হয় ১৬ সিএফটি ধারণক্ষমতার একটি ফ্রিজ।

ঘাসি নৌকা বিভাগে যৌথভাবে চ্যাম্পিয়ন হয় মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ‘বাইমাইল এক্সপ্রেস’ ও ‘কালাম সিকদার এক্সপ্রেস’। দুই নৌকার দলই ১০০ সিসি মোটরসাইকেল পুরস্কার পায়।

ছান্দি নৌকা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় হরিরামপুর উপজেলার ‘গায়ান বাড়ি’। বিজয়ী দলকে দেওয়া হয় একটি ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল। একই বিভাগে রানার্সআপ ঘিওর উপজেলার ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’ পায় ১৬ সিএফটি ধারণক্ষমতার একটি ফ্রিজ।

পানসি নৌকা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ‘জাগীর জনতা এক্সপ্রেস’। তাদের পুরস্কার দেওয়া হয় একটি ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল। এ বিভাগে দ্বিতীয় হয় পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ‘আজম ব্রাদার্স’। রানার্সআপ হিসেবে তারা পায় ১৬ সিএফটি ধারণক্ষমতার একটি ফ্রিজ।

প্রধান চারটি বিভাগের বাইরেও অংশগ্রহণকারী নৌকাগুলোর জন্য ছিল বিভিন্ন পুরস্কার। পাঁচটি নৌকার দলকে দেওয়া হয় ১১ সিএফটি ধারণক্ষমতার ফ্রিজ এবং আরও সাতটি নৌকার প্রতিনিধিদের দেওয়া হয় ৮ সিএফটি ধারণক্ষমতার ফ্রিজ। ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ বিভাগে অংশ নেওয়া নৌকা ও ব্যক্তিদের জন্য পুরস্কার হিসেবে রাখা হয় টেলিভিশন, প্রেসার কুকার ও রাইস কুকার।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য, খাদ্যমন্ত্রী এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম রিতা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর, জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম, নৌকাবাইচ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আ তা ম জহীর আলম খান লোদী এবং সদস্যসচিব মাসুদ পারভেজ। জেলা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

এবারের প্রতিযোগিতায় দর্শকদের বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নের বাগুয়ারচর গ্রামের ‘মায়ের দোয়া’। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা এই খেল্লা নৌকাটির প্রতি শুরু থেকেই দর্শকদের নজর ছিল। শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রত্যাশা পূরণ করে নৌকাটির দল।

‘মায়ের দোয়া’র পরিচালক মজিবুর রহমান জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে রৌমারীর বন্দবেড় ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাগুয়ারচর গ্রাম থেকে নৌকাটি মানিকগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে বিভিন্ন নদীপথ পাড়ি দিয়ে কালীগঙ্গার বেউথা ঘাটে পৌঁছাতে তাদের তিন দিন সময় লাগে।

তিনি জানান, শাল কাঠ দিয়ে তৈরি নৌকাটির নির্মাণকাজে ব্যয় হয়েছে প্রায় ছয় লাখ টাকা। এক বছর ধরে এটি তৈরি করা হয়েছে। মানিকগঞ্জের প্রতিযোগিতাটিই ছিল নৌকাটির প্রথম নৌকাবাইচ। প্রথম অংশগ্রহণেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় তাঁরা আনন্দিত। আয়োজকদের ব্যবস্থাপনাতেও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তিনি।

নৌকাবাইচ দেখতে শুধু মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা থেকেই নয়, আশপাশের জেলা থেকেও বিপুলসংখ্যক মানুষ আসেন। নদীর দুই তীরে দাঁড়ানোর জায়গা খুঁজে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন দর্শকেরা। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, আবার কেউ সুবিধাজনক জায়গা থেকে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন। নৌকাগুলোর দ্রুতগতির ছুটে চলা, মাঝিদের সমন্বিত বৈঠা চালানো এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।

নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে নদীর তীরে বসে গ্রামীণ মেলা। সেখানে বিভিন্ন পণ্যের দোকান ও মানুষের আনাগোনায় উৎসবের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। নদীকেন্দ্রিক লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের এই মিলনমেলা স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শকদেরও আকৃষ্ট করে।

বাংলার নদী ও জনজীবনের সঙ্গে নৌকাবাইচের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। একসময় বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের প্রতিযোগিতা ছিল গ্রামীণ বিনোদনের অন্যতম প্রধান আয়োজন। নদীপথে যোগাযোগ, মাঝিদের দক্ষতা এবং দলগত সমন্বয়ের ঐতিহ্যও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সময়ের সঙ্গে অনেক এলাকায় এ আয়োজন কমে এলেও কালীগঙ্গার বেউথা ঘাটের এই প্রতিযোগিতায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি নদীকেন্দ্রিক লোকজ সংস্কৃতির প্রতি মানুষের আগ্রহের পরিচয় দিয়েছে। আর এবারের আসরে কুড়িগ্রাম থেকে আসা ‘মায়ের দোয়া’র শিরোপা জয় নৌকাবাইচকে ঘিরে সেই উৎসবের স্মৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।