ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার শাসন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা নানা অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, কর্মকর্তা এবং প্রধান উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যক্রম ঘিরে রাজনৈতিক ও জনমহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল সুশাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বৈষম্য কমানো। তবে পরবর্তী সময়ে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। এর মধ্যেই দুর্নীতি ও অর্থপাচারসংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ সামনে আসে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ইউনূস সরকারের সময়কার দুর্নীতি নিয়ে অন্তত দুই হাজার অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ ও বদলিতে অনিয়ম এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের মতো বিষয় রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে প্রাথমিক পর্যায়ে নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দুর্নীতির অর্থ ব্যবহার করে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখা হয়েছে।
অভিযোগের আরও একটি অংশে বলা হয়েছে, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। চারটি দেশের ক্ষেত্রে অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ হাজার কোটি টাকা। আসিফ মাহমুদের আত্মীয়দের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব তথ্য বর্তমানে অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। অর্থের প্রকৃত উৎস, লেনদেনের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হলে তদন্তের ফলাফল জানা প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ দুদকে জমা পড়া মানেই তা প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু আসিফ মাহমুদ নন, অন্তর্বর্তী সরকারের আরও কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও লিখিত অভিযোগ রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস এবং কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও নরওয়ের নাম এসেছে।
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের একটি অংশে নরওয়েতে তাঁর একটি হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৭৪ কোটি টাকা জমা থাকার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে ওই অর্থের সঙ্গে টেলিনর ও গ্রামীণফোনের লেনদেনের সম্পর্কের কথাও বলা হয়েছে। তবে এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ব্যাংক নথি, লেনদেনের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক চুক্তি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও বড় অঙ্কের অর্থপাচারের অভিযোগ জমা পড়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে বিচারক, আইন কর্মকর্তা ও সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ এবং বদলিতে আর্থিক অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি জামিন ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে সুইস ব্যাংকে হিসাব এবং যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ থাকার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডায় তাঁর সম্পদ থাকার দাবি করা হয়েছে অভিযোগপত্রে। এসব দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য সম্পত্তির মালিকানা, ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা জরুরি।
আরেক সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধেও প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ থাকার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব অভিযোগে তাঁর স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর মাধ্যমে সম্পদ বিদেশে স্থানান্তর এবং দুবাই ও লন্ডনে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি সাবেক উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের এক নিকটাত্মীয়ের নামে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বাড়ি কেনার অভিযোগও দুদকে জমা পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দু-একজন বাদে অন্তর্বর্তী সরকারের অধিকাংশ উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই কোনো না কোনো অভিযোগ জমা পড়েছে। সব মিলিয়ে ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ থাকার দাবি করা হয়েছে।
এদিকে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির বিষয়টিও প্রতিবেদনে আলোচনায় এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ হয়েছে। হিসাবে এটি প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধির সমান।
তবে বিদেশি ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধি পেলেই তা দুর্নীতি বা অর্থপাচারের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় না। অর্থের উৎস, হিসাবের মালিকানা এবং লেনদেনের বৈধতা আলাদাভাবে যাচাই করতে হয়। একইভাবে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাঁকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা আইনগতভাবে সঙ্গত নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুদকের সামনে বড় দায়িত্ব হলো অভিযোগগুলোর রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রচারের মাত্রা বিবেচনা না করে প্রমাণের ভিত্তিতে এগোনো। ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির নথি, করসংক্রান্ত তথ্য, দেশ-বিদেশের আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি নির্ধারণ করা সম্ভব।
ইউনূস সরকারের সময়কার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যতই বাড়ুক, শেষ পর্যন্ত নিরপেক্ষ তদন্তই প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার করতে পারে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। আবার অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি।
দেশবাসীর প্রত্যাশা, সাবেক উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ থাকলে তা একই মানদণ্ডে যাচাই করা হবে। স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ই স্পষ্ট হবে না, একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়েও একটি নির্ভরযোগ্য চিত্র সামনে আসবে।









