,

ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি ছাড়াল ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আর্থিক দুর্বলতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের ২১টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিন মাস আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ মূলধন পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন ঘাটতিও বেড়েছে। মার্চে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে জুনে এই ঘাটতি আরও বেড়ে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে কিছু ব্যাংকের মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে। সেই উদ্বৃত্ত ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর কিছুটা সমন্বয় করায় পুরো খাতের নিট মূলধন ঘাটতি মার্চে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে নিট ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বাড়ায় বাড়ছে প্রভিশনের চাপ

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আগ্রাসী ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদনের মতো প্রবণতা ব্যাংকিং খাতের মূলধন পরিস্থিতিকে দুর্বল করেছে। ঋণ যখন খেলাপি বা শ্রেণিকৃত হয়ে যায়, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় বেশি অর্থ প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়।

সাধারণ বা নিয়মিত ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে সাধারণত ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখতে হয়। কিন্তু ঋণ শ্রেণিকৃত হওয়ার পর তার ধরন ও অবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতিও বাড়ে। কারণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংককে প্রভিশন রাখতে হয়, যা মুনাফা কমিয়ে দেয়। ধারাবাহিকভাবে লোকসান হলে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চে দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে এর অংশ ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এই উচ্চ হার ব্যাংকগুলোর আয়, মুনাফা এবং মূলধনের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।

দুর্বল ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণে ৪০ হাজার কোটি টাকা

দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে সরকার চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনঃমূলধনীকরণ করা হচ্ছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু মূলধন জোগান দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। খেলাপি ঋণের কারণ, ঋণ অনুমোদন ও আদায়ের দুর্বলতা এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ঘাটতিও মোকাবিলা করা জরুরি। কারণ নতুন করে মূলধন দেওয়ার পরও যদি একইভাবে ঋণখেলাপি বাড়তে থাকে, তাহলে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি আবারও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

আমানতকারী থেকে বিদেশি ঋণদাতা—চাপে পুরো খাত

ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য সমস্যা তৈরি করে না; এর প্রভাব আমানতকারী এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে।

মূলধন ব্যাংকের আর্থিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। পর্যাপ্ত মূলধন থাকলে কোনো আকস্মিক ক্ষতি বা আর্থিক চাপ মোকাবিলা করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। বিপরীতে মূলধন ঋণাত্মক বা ঘাটতিতে থাকলে ব্যাংকের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং স্বাভাবিক ব্যবসা পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এর পাশাপাশি বিদেশি ঋণদাতা ও পাওনাদারদের আস্থাতেও প্রভাব পড়তে পারে। এক বা দুটি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে থাকলে পরিস্থিতি হয়তো নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকে। কিন্তু ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২০ থেকে ২১টি ব্যাংক দীর্ঘ সময় ধরে মূলধন ঘাটতিতে থাকলে সেটি পুরো ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন।

CRAR আরও নেমে হয়েছে ঋণাত্মক ৩.১৭ শতাংশ

ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ সূচক ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও বা CRAR-ও আরও খারাপ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতের CRAR নেমে এসেছে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে। ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম CRAR ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন পরিস্থিতি অনেক শক্তিশালী। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে পাকিস্তানের ব্যাংকিং খাতে CRAR ছিল প্রায় ২১ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৯ শতাংশের বেশি এবং ভারতে গড় CRAR ছিল ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ।

NRBC ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক মূলধন, বিশেষ করে CRAR বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে ব্যাংককে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রক, আর্থিক ও পরিচালনাগত সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।

এর মধ্যে লভ্যাংশ ও প্রণোদনা বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ, ক্রেডিট রেটিংয়ের অবনতি, আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়া, তহবিল সংগ্রহ ও পরিশোধ সক্ষমতার ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ট্রেড ফাইন্যান্সে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বেশি প্রভিশন রাখার কারণে মুনাফার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

মূলধন পর্যাপ্ত না থাকলে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে যায়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য লোকসান সামাল দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। ফলে মূলধন ঘাটতির বিষয়টি কেবল হিসাবের একটি সংখ্যা নয়; এটি ব্যাংকের স্থায়িত্ব, আমানতকারীর আস্থা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

যেসব ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি সবচেয়ে বেশি

২০২৬ সালের মার্চে দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে ছিল ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

ব্যাংকের নামমার্চ ২০২৬ মূলধন ঘাটতি
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক৬৬,২৬৪.৮০ কোটি টাকা
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক৩১,৬৮৭.১৭ কোটি টাকা
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক৩০,৯৩৬.৬৭ কোটি টাকা
ইউনিয়ন ব্যাংক৩০,৫৯৪.৫৬ কোটি টাকা
এক্সিম ব্যাংক৩০,৩০২.২৩ কোটি টাকা
জনতা ব্যাংক১৮,৩৫৪.৯০ কোটি টাকা
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক১৬,২৯৭.৬১ কোটি টাকা
ন্যাশনাল ব্যাংক১১,৯৮৪.৯৮ কোটি টাকা
এবি ব্যাংক৮,৪৮৭.৫৯ কোটি টাকা
অগ্রণী ব্যাংক৮,২৩৪.৯২ কোটি টাকা

তালিকায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি অন্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। মার্চে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ছিল ৬৬ হাজার ২৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি ৩১ হাজার ৬৮৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

সামগ্রিক চিত্র বলছে, খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি এবং মূলধনের দুর্বলতা এখন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে। একদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনঃমূলধনীকরণের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে মূলধন ঘাটতি ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।