শক্তি, সামর্থ্য, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও ফিফা র্যাঙ্কিং—সব বিবেচনায় উত্তর কোরিয়ার চেয়ে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। এর সঙ্গে ম্যাচের শুরুতে একাধিক নতুন খেলোয়াড়কে নিয়ে একাদশ সাজানোর সিদ্ধান্তও দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে। ফলে এশিয়ান কাপের প্রথম ম্যাচেই ভয়াবহ এক পরাজয়ের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের সিনিয়র নারী ফুটবল দল।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) চীনের নাগাই স্টেডিয়ামে এশিয়ান কাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে উত্তর কোরিয়ার মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। ম্যাচে পুরো সময়জুড়েই আধিপত্য ধরে রাখে উত্তর কোরিয়া। শেষ পর্যন্ত ১০-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারতে হয় বাংলাদেশের মেয়েদের।
এই পরাজয় বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানের হার হিসেবে যুক্ত হলো। এর আগে জাতীয় নারী দলের সর্বোচ্চ ব্যবধানে পরাজয়ের রেকর্ড ছিল ৯-০। এবার সেই ব্যবধানও ছাড়িয়ে গেল দল। এক ম্যাচে ১০ গোল হজম করে নতুন এক বিব্রতকর রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ।
ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের খেলায় অস্বস্তি স্পষ্ট ছিল। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার বদলে বারবার নিজেদের অর্ধে ফিরে যেতে হয়েছে খেলোয়াড়দের। পাস দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল, বল নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং রক্ষণভাগে সমন্বয়ের অভাব উত্তর কোরিয়াকে একের পর এক আক্রমণের সুযোগ করে দেয়। গোলরক্ষক ও ডিফেন্ডারদের মধ্যেও বেশ কয়েকবার বোঝাপড়ার ঘাটতি দেখা যায়।
তৃতীয় মিনিটেই বাংলাদেশ প্রথম ধাক্কা খায়। উত্তর কোরিয়া বল জালে পাঠালেও ভিএআরের সহায়তায় অফসাইড শনাক্ত হওয়ায় গোলটি বাতিল হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে বাংলাদেশ কিছুটা স্বস্তি পেলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
এরপর দ্রুত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় উত্তর কোরিয়া। মাত্র ১২ মিনিটের মধ্যেই বাংলাদেশের জালে তিনবার বল পাঠায় তারা। ২০ মিনিটের মাথায় ব্যবধান দাঁড়ায় ৪-০। প্রথমার্ধেই ম্যাচের ফল অনেকটা নির্ধারিত হয়ে যায়, কারণ বাংলাদেশের জন্য আক্রমণে ওঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছিল না, আর রক্ষণভাগকে সামলাতে হচ্ছিল একের পর এক চাপ।
উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় গোলটিই বাংলাদেশের রক্ষণভাগের দুর্বলতার একটি পরিষ্কার উদাহরণ হয়ে ওঠে। শর্ট কর্নার থেকে পাওয়া বলে বক্সের দিকে ক্রস করেন উত্তর কোরিয়ার এক খেলোয়াড়। বলটি ডিফেন্ডার আফঈদা খন্দকারের নাগালের মধ্যেই ছিল। তিনি ক্লিয়ার করার জন্য পা বাড়ালেও শেষ মুহূর্তে পা সরিয়ে নেন। একই সময়ে গোলরক্ষক মিলি আক্তারও নিজের জায়গা থেকে বেরিয়ে আসেননি। ফলে কোনো খেলোয়াড়ের স্পর্শ ছাড়াই বলটি দূরের পোস্ট ঘেঁষে জালে ঢুকে যায়।
প্রথমার্ধে নতুন কয়েকজন খেলোয়াড়কে একাদশে রাখার সিদ্ধান্তও বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে বাড়তি চাপ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সামান্য ভুলও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। উত্তর কোরিয়ার দ্রুত পাসিং, আক্রমণের গতি ও বল দখলের দক্ষতার বিপরীতে বাংলাদেশ সেই চাপ সামলাতে পারেনি।
ম্যাচ যত এগিয়েছে, বাংলাদেশের রক্ষণ ততই ভেঙে পড়েছে। একদিকে উত্তর কোরিয়ার আক্রমণ থামানোর জন্য পর্যাপ্ত চাপ তৈরি করা যায়নি, অন্যদিকে নিজেদের বল দখলে রাখার সময়ও ছিল খুব কম। ফলে উত্তর কোরিয়ার খেলোয়াড়েরা বারবার বাংলাদেশের বক্সে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন।
১০-০ ব্যবধানের এই হার শুধু একটি ম্যাচের পরাজয় নয়, বাংলাদেশের নারী ফুটবলের জন্য বড় সতর্কবার্তাও। এশিয়ান কাপের মতো বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে রক্ষণে সমন্বয়, পাসিংয়ে নির্ভুলতা, বল ধরে রাখার সক্ষমতা এবং মানসিক দৃঢ়তা—সব ক্ষেত্রেই উন্নতির প্রয়োজন। বিশেষ করে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে শুরুতেই গোল হজম করলে ম্যাচে ফিরে আসা কতটা কঠিন, নাগাই স্টেডিয়ামের এই ম্যাচ সেটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে।









