,

নিখোঁজ শিশুর সন্ধানে পুলিশের তদন্ত নিয়ে অভিযোগ

গত ৩০ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর বনানী এলাকায় মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে নিখোঁজ হয় চার বছরের শিশু সাইবা। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে জুতা কিনতে গিয়েছিলেন মা বিথী আক্তার। বনানী সৈনিক ক্লাবের সামনের ফুটওভার ব্রিজের কাছে শিশুটিকে দাঁড় করিয়ে পাশের ফুটপাতে জুতা কিনছিলেন তিনি। অল্প সময় পর ফিরে এসে দেখেন, সেখানে আর নেই সাইবা।

এরপর শুরু হয় পরিবারের দৌড়ঝাঁপ। প্রথমে আশপাশের এলাকায় খোঁজাখুঁজি, পরে থানায় গিয়ে অভিযোগ জানানোর চেষ্টা। পরিবারের দাবি, নিখোঁজের দিনই বনানী থানায় গেলেও তাদের সাধারণ ডায়েরি নেওয়া হয়নি। পরদিনও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাদের। শেষ পর্যন্ত ১ সেপ্টেম্বর বিকেলে, অর্থাৎ নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দুই দিন পর সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করা হয়।

সাইবার নানী শরীফা বেগমের অভিযোগ, সাধারণ ডায়েরির তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছেন, যাতে পরিবারের মধ্যে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আরও হতাশা তৈরি হয়। তার দাবি, তদন্ত কর্মকর্তা তাদের নিজেদের উদ্যোগে শিশুটিকে খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও শিশুটির সন্ধানে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা তারা দেখতে পাননি।

তবে অভিযুক্ত তদন্ত কর্মকর্তা মো. বিল্লাল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, সাধারণ ডায়েরির কপি পাওয়ার পরপরই তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সেখানে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় ফুটেজ সংগ্রহের সুযোগ পাওয়া যায়নি। তার দাবি, পুলিশের পক্ষ থেকে করণীয় অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা চলছে।

সাইবার ঘটনা সামনে আসার পর নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের দীর্ঘদিনের অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি করতে অভিভাবকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কেউ কেউ একাধিকবার থানায় যাওয়ার পর অভিযোগ নথিভুক্ত করাতে সক্ষম হন। অভিযোগ নেওয়ার পর তদন্তে প্রত্যাশিত তৎপরতা না থাকার কথাও বলেছেন কয়েকজন স্বজন।

৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সামাজিক সংগঠন মুন এলার্ট আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেন নিখোঁজ শিশুদের স্বজনেরা। সেখানে ৩৫টি ভুক্তভোগী পরিবার উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে অন্তত দুই ডজন পরিবারের সদস্য নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সন্তান হারানোর কথা বলতে গিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

সাত মাসে নিখোঁজ ১৫ হাজারের বেশি শিশু

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনও সন্ধান পাওয়া যায়নি ২ হাজার ৩৮ শিশুর। অর্থাৎ ওই সময়ের মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ এখনও নিখোঁজ।

বয়সভিত্তিক তথ্যেও বড় পার্থক্য দেখা যায়। শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সাত মাসে ৪৭৪টি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জন এখনও নিখোঁজ।

অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরির সংখ্যা ১৫ হাজার ২৪৩। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হলেও ১ হাজার ৯৭০ জনের সন্ধান এখনও মেলেনি।

এই পরিসংখ্যান বলছে, শিশু নিখোঁজের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। বিপুলসংখ্যক পরিবার এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নিখোঁজের পর দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, তথ্য সংগ্রহ, সম্ভাব্য স্থানগুলোতে অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পুলিশের বক্তব্য কী

নিখোঁজ শিশুদের স্বজনদের অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও পরিচালনা) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেছেন, কোন থানায় গিয়ে কে অসহযোগিতার শিকার হয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে অভিযোগ যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, শিশু নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখার জন্য মাঠপর্যায়ের সদস্যদের নির্দেশনা রয়েছে। কোনো থানা সাধারণ ডায়েরি নিতে অনীহা দেখিয়েছে বা কোনো পরিবারকে অসহযোগিতা করেছে—এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, শিশু উদ্ধারের দায়িত্বও পুলিশের। কোনো তদন্ত কর্মকর্তা যদি পরিবারকে নিজেরাই শিশু খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে অনলাইন সাধারণ ডায়েরির ব্যবস্থা থাকায় অভিযোগ গ্রহণে বিলম্বের সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

সামিরার পরিবারও এক বছর ধরে অপেক্ষায়

খুলনার কয়রা থেকে নিখোঁজ সামিরার পরিবারের অভিজ্ঞতাও সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে। গত বছরের ২৬ আগস্ট বাজার এলাকায় নিখোঁজ হয় শিশুটি। তার মা বিলকিস বেগম জানান, সামিরা তাকে অনুসরণ করে বাজারে গিয়েছিল। পরে এক পর্যায়ে শিশুটি হাসতে হাসতে তার কাকার ভাজাপোড়ার দোকানের দিকে চলে যায়। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি।

পরিবারের দাবি, স্থানীয়দের কাছ থেকে তারা জানতে পারেন, আজমির নামের ১৯ বছর বয়সী এক যুবক সামিরাকে ভ্যানে বসিয়ে মিষ্টি কিনে খাইয়েছিল। পরে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে গেলেও শিশুটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

বিলকিস বেগমের অভিযোগ, জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওই যুবক শিশুটিকে চেনার কথা স্বীকার করলেও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ঘটনার শুরুতেই আরও কঠোরভাবে তদন্ত করা হলে হয়তো সামিরার সন্ধান পাওয়া সম্ভব হতো।

মিরপুরের ইব্রাহিমের খোঁজও মেলেনি

রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকা থেকে গত ১৩ মে নিখোঁজ হয় শিশু মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তার বাবা মোহাম্মদ জসিম পেশায় ফুচকা বিক্রেতা। তার দাবি, ইব্রাহিম বাসার ভবনে ঢোকার পর আর বের হয়নি। ভবনের সিসিটিভি ফুটেজেও তাকে বাইরে বের হতে দেখা যায়নি বলে জানান তিনি।

জসিমের অভিযোগ, পল্লবী থানায় প্রথমে সাধারণ ডায়েরি নেওয়া হয়নি। পরে ১৫ মে সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করা হয়। তার দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে থানায় যোগাযোগের পর ১৭ দিন পর মামলা নেওয়া হয় এবং তদন্তের দায়িত্ব গোয়েন্দা পুলিশের কাছে দেওয়া হয়।

সন্তানের সন্ধান না পাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে নিজের আর্থিক সামর্থ্যের কথাও তুলে ধরে সন্তানের সন্ধানে সরকারের সহযোগিতা চান এই বাবা।

১৬ মাস ধরে তামিমের অপেক্ষায় বাবা

রাজবাড়ীর অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মো. নজরুল ইসলামও সংবাদ সম্মেলনে নিজের সন্তানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। তার ছেলে তামিম ২০২৫ সালের ২০ মে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। স্কুলে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, সেদিন তামিম সেখানে উপস্থিতই হয়নি।

নজরুল ইসলামের দাবি, নিজে পুলিশের সাবেক সদস্য হওয়া সত্ত্বেও সন্তানকে খুঁজে পেতে তিনি কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে করতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, সন্তানের সন্ধানের আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছেন তিনি।

একটি পরিবারের কাছে সন্তান নিখোঁজ হওয়া শুধু একটি মামলা বা সাধারণ ডায়েরির বিষয় নয়। প্রতিটি ঘণ্টা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অভিযোগ গ্রহণে বিলম্ব, তদন্তে ধীরগতি কিংবা পরিবারের সঙ্গে অসহযোগিতার অভিযোগ থাকলে তা দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে।

মুন এলার্টের তথ্য

মুন এলার্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির কার্যক্রম শুরুর পর থেকে শিশু নিখোঁজের ১ হাজার ২২৬টি অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে। এর মধ্যে পুলিশের সহযোগিতায় আট শতাধিক শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। সংগঠনটি ১৭১টি ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা জারি করেছে এবং এসব সতর্কবার্তার পর ১১৯ শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়কারী সাদাত রহমান বলেন, উন্নত দেশগুলোতে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় দ্রুত যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, বাংলাদেশেও কার্যকর এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তার মতে, শিশু নিখোঁজের ঘটনায় দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে অনুসন্ধান ও উদ্ধারের প্রতিটি ধাপে সরকারি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত ভূমিকা জরুরি।

শিশু নিখোঁজের ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব কোথায় শুরু এবং কোথায় শেষ—সেটি নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সহযোগিতার নিশ্চয়তা দেওয়া হলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেই বক্তব্যের মিল কতটা, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে বাস্তব পদক্ষেপের ওপর।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | সাব-এডিটর । জিলাইভ বাংলা

https://glive24.com/

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।