কুড়িগ্রামে সার বিতরণ ও সরবরাহ নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনা এবার রৌমারীতেও ছড়িয়ে পড়েছে। উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় এক সার ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে শতাধিক বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিক্ষুব্ধ কৃষকদের বিরুদ্ধে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে মেসার্স মিতা-হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামে এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে কৃষকদের গুদামের ভেতর থেকে সারের বস্তা বের করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। কেউ মাথায় করে বস্তা বহন করেন, আবার কেউ অটোরিকশা ও ভ্যানে করে সার নিয়ে যান। তবে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে সরাসরি সার লুটের ঘটনা হিসেবে স্বীকার করা হয়নি। প্রশাসনের দাবি, সার নেওয়ার সময় কিছুটা হুড়োহুড়ি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল এবং সেই পরিস্থিতিতেই কয়েকজন কৃষক বস্তা নিয়ে চলে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তাদের ভাষ্য, নির্ধারিত সময়ে সার বিক্রি শুরু না হওয়ায় ভোররাত থেকে অপেক্ষা করা কৃষকদের মধ্যে ধীরে ধীরে ক্ষোভ তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও ডিলার, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি না থাকায় পরিস্থিতি একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
স্থানীয় কৃষক জাকির হোসেন জানান, বন্দবেড় ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডসহ আশপাশের এলাকার বহু কৃষক ভোররাত থেকেই গুদামের সামনে জড়ো হন। তাদের প্রত্যাশা ছিল নির্ধারিত সময়ে সার সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু সকাল গড়িয়ে গেলেও বিক্রি শুরু না হওয়ায় অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। তাঁর দাবি, বেলা ১১টা পর্যন্ত সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় একপর্যায়ে কৃষকেরা গুদামের টিনের বেড়া ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সারের বস্তা নিয়ে যেতে শুরু করেন।
ডিলারের গুদামের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সার বিতরণ শুরুর কথা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রশাসনের সহযোগিতা নেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যেই কয়েকজন কৃষক গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে ফেলেন।
তিনি জানান, ঘটনার পর আতঙ্কে কিছু কৃষক সারের বস্তা ফেরত দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বস্তা রাস্তার পাশে রেখে চলে গেছেন। কয়েকজন সার নেওয়ার পর মূল্যও পরিশোধ করেছেন। ফলে ঠিক কত বস্তা সার গুদাম থেকে বের হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। দিন শেষে মজুত ও বিক্রির হিসাব মিলিয়ে প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে বলে জানান তিনি।
গুদাম ব্যবস্থাপকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ আগস্ট তিন শতাধিক বস্তা ইউরিয়া সার বিক্রি করা হয়েছিল। সোমবার সকালে গুদামে মোট ৭৩৯ বস্তা সার মজুত ছিল। তাঁর দাবি, গুদামে সারের ঘাটতি ছিল না। তবে কৃষকদের মধ্যে সার না পাওয়ার আশঙ্কা এবং বিক্রি নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনার কারণে পরিস্থিতি দ্রুত অস্থির হয়ে পড়ে।
রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলম বসুনিয়া বলেন, উপজেলায় সার সংকট নেই। কৃষকেরা ধৈর্য ধরে নিয়ম অনুযায়ী সার সংগ্রহ করলে বিতরণে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মঙ্গলবার থেকে খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা করা হবে বলেও তিনি জানান। তাঁর মতে, এতে একদিকে কৃষকদের চাহিদা মেটানো সহজ হবে, অন্যদিকে সার নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও উদ্বেগও কমবে।
রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল হাসান বলেন, বস্তা লুট করে নিয়ে যাওয়ার তথ্য পুরোপুরি সঠিক নয়। তিনি নিজে বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। একটি বিক্রয়কেন্দ্রে কিছুটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিলেও পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর কৃষকেরা সার কেনার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান এবং নিয়ম মেনে সার নিয়ে ফিরে যান।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামে কৃষকদের কাছে সার পৌঁছে দিতে খুচরা বিক্রেতাদের সম্পৃক্ত করা যায় কি না, সে বিষয়েও আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
রৌমারীর ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা কি না, তা নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা থাকলেও কুড়িগ্রামের অন্যান্য উপজেলায় সাম্প্রতিক সার বিতরণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে গত ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজার এলাকায় এক ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে কৃষকদের বিরুদ্ধে। সে সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল।
রৌমারীর সর্বশেষ ঘটনাও দেখিয়েছে, কৃষকদের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ নিয়ে সামান্য অনিশ্চয়তা তৈরি হলেই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের উপস্থিতি, স্বচ্ছ বিতরণ ব্যবস্থা এবং সরকার নির্ধারিত দামে সার বিক্রি নিশ্চিত করা না গেলে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এখন গুদামের প্রকৃত মজুত ও বিতরণ হিসাব যাচাই এবং কৃষকদের মধ্যে সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।









