ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে সৌরভ গাঙ্গুলির অধিনায়কত্বকে অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল হিসেবে দেখেন। তাঁর নেতৃত্বে শুধু দলের ফলাফলেই পরিবর্তন আসেনি, বদলেছিল মাঠে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করার ধরনও। ভারতের সাবেক ক্রিকেটার দীপ দাশগুপ্তের মতে, গাঙ্গুলির সময় থেকেই ভারতীয় দল প্রতিপক্ষের স্লেজিং বা মানসিক চাপের জবাব দিতে আরও দৃঢ় ও প্রকাশ্য অবস্থান নিতে শুরু করে।
দূরদর্শনের অনুষ্ঠান ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান ক্রিকেট শো’-তে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে দাশগুপ্ত বলেন, গাঙ্গুলির নেতৃত্বে ভারতীয় দলের ব্যক্তিত্বই যেন বদলে গিয়েছিল। ভারতের হয়ে আটটি টেস্ট ও পাঁচটি একদিনের ম্যাচ খেলা এই সাবেক ক্রিকেটারের চোখে, পরিবর্তনটি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০০১ সাল থেকে ২০০৩-০৪ মৌসুমের অস্ট্রেলিয়া সফরের মধ্যবর্তী সময়ে।
দাশগুপ্তের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে ভারতীয় খেলোয়াড়েরা মাঠে প্রতিপক্ষের কথার জবাব না দিয়ে নিজেদের রাগ ও ক্ষোভ খেলায় কাজে লাগানোর চেষ্টা করতেন। গাঙ্গুলির নেতৃত্বে সেই মানসিকতায় নতুন একটি মাত্রা যোগ হয়। প্রতিপক্ষ মাঠে কথার লড়াই শুরু করলে ভারতীয় খেলোয়াড়েরাও প্রয়োজনে সরাসরি পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেন।
তিনি মনে করেন, এই পরিবর্তনের পেছনে গাঙ্গুলির ব্যক্তিত্বের বড় প্রভাব ছিল। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘মহারাজ’, আর অধিনায়ক হিসেবে তাঁর মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও কর্তৃত্বের প্রকাশ ছিল স্পষ্ট। দাশগুপ্তের ভাষায়, গাঙ্গুলির সেই মানসিকতা ধীরে ধীরে পুরো দলের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে বিদেশের মাটিতে ভারতীয় দলকে আর শুধু প্রতিভাবান একটি দল হিসেবে দেখা হচ্ছিল না; তারা প্রতিপক্ষের চোখে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও আত্মবিশ্বাসী দল হয়ে উঠছিল।
গাঙ্গুলির অধিনায়কত্বের পরিসংখ্যানও তাঁর নেতৃত্বের গুরুত্ব বোঝায়। সব সংস্করণ মিলিয়ে তিনি ভারতের হয়ে ১৯৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেছেন। এর মধ্যে ভারত জিতেছে ৯৭টি ম্যাচে এবং হেরেছে ৭৯টিতে। টেস্টে তাঁর নেতৃত্বে ৪৯ ম্যাচের মধ্যে ২১টিতে জয় পেয়েছে ভারত, ১৩টিতে হেরেছে এবং ১৫টি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
তবে গাঙ্গুলির সবচেয়ে বড় অবদান শুধু পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর অধিনায়কত্বে ভারত বিদেশের মাটিতে বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয়ের আত্মবিশ্বাস অর্জন করে। ২০০১ সালে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি জয় ছিল সেই সময়ের অন্যতম স্মরণীয় সাফল্য। কলকাতার ঐতিহাসিক টেস্টে ফলো-অন করেও ভারত অস্ট্রেলিয়াকে হারায়, যা দলের মানসিক দৃঢ়তার অন্যতম প্রতীক হয়ে আছে।
এরপর বিদেশের মাটিতেও আসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের লিডসে ভারতের টেস্ট জয় এবং ২০০৩ সালে অ্যাডিলেডে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় দলের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়। একই সময়ে সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও ভারত গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করে।
২০০২ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনালে ভারতের জয় বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। লর্ডসের সেই ম্যাচে ভারতের রান তাড়ার শেষদিকে মোহাম্মদ কাইফ ও যুবরাজ সিংয়ের জুটি দলকে জয় এনে দেয়। জয়ের পর গাঙ্গুলির লর্ডসের বারান্দায় জামা খুলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার দৃশ্যও ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত হয়ে রয়েছে।
২০০২ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও ভারত শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যৌথভাবে শিরোপা জেতে। ফাইনাল বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হওয়ায় দুই দলকেই যৌথ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়। এর পরের বছর ২০০৩ বিশ্বকাপে গাঙ্গুলির নেতৃত্বে ভারত ফাইনালে ওঠে। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে ভারত দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত রানার্সআপ হয়।
গাঙ্গুলির সময় তৈরি হওয়া এই আত্মবিশ্বাস পরবর্তী অধিনায়কদের সময়েও ভারতীয় ক্রিকেটে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হয়। মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে ভারত সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আরও বড় সাফল্য পায়, আর বিরাট কোহলির সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে বিদেশের মাটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মান আরও উঁচুতে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতার শিকড় গাঙ্গুলির অধিনায়কত্বের সময়কার মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেন দাশগুপ্ত।
তাঁর বক্তব্যের মূল কথা তাই শুধু স্লেজিংয়ের পাল্টা জবাব দেওয়া নয়। বিষয়টি ছিল দলের আত্মপরিচয় বদলে যাওয়া। ভারতীয় ক্রিকেটাররা প্রতিপক্ষকে সমীহ করলেও আর ভয় পেতেন না—বরং মাঠে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দেওয়ার সাহস দেখাতেন।
দাশগুপ্তের চোখে, ২০০১ থেকে ২০০৩-০৪ সালের মধ্যে সেই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছিল। আর সেই বদলের কেন্দ্রে ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি—একজন অধিনায়ক, যিনি ভারতীয় দলকে শুধু ম্যাচ জেতানোর চেষ্টা করেননি, মাঠে নিজেদের শক্তি ও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করার সংস্কৃতিও গড়ে তুলেছিলেন।









