জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

কার্যকর বিমা কার্যক্রমে সৌদি খাতে মুনাফা বেড়েছে ২৪.৩%

সৌদি আরবের বিমা খাতে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তালিকাভুক্ত বিমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা বেড়ে প্রায় ১৮৭ কোটি সৌদি রিয়ালে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। মার্কিন মুদ্রায় এই মুনাফার পরিমাণ প্রায় ৪৯৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির পেছনে শুধু বিমা ব্যবসার পরিমাণ বাড়াই নয়, বরং বিমা-সেবা থেকে আয়, পরিচালন দক্ষতা, দাবি নিষ্পত্তি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় উন্নতিরও ভূমিকা রয়েছে। ফলে সৌদি আরবের বিমা কোম্পানিগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি তুলনামূলকভাবে টেকসই মুনাফা অর্জনের সক্ষমতাও বাড়াতে পারছে।

দেশটির অর্থনীতিতে বড় প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নতুন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের বিস্তার বিমা পণ্যের চাহিদা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও মোটর বিমা বাজারও গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বিমা ও পুনর্বিমা আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগ থেকে পাওয়া মুনাফাও সামগ্রিক আর্থিক ফলাফলকে শক্তিশালী করেছে।

তবে সব কোম্পানির ফলাফল একরকম ছিল না। প্রথম ছয় মাসে ১৭টি কোম্পানি মুনাফা করেছে। এর মধ্যে ১১টি কোম্পানির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। বিপরীতে, ৯টি কোম্পানি লোকসান করেছে।

সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে বুপা আরাবিয়া। কোম্পানিটির নিট মুনাফা হয়েছে ৬৯৪ দশমিক ০৮ মিলিয়ন রিয়াল, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের ৬৬৬ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন রিয়ালের তুলনায় ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। বিমা-সেবা কার্যক্রমের উন্নতি, ব্যবসার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ থেকে বেশি আয় এবং অন্যান্য আয়ের প্রবৃদ্ধি এই ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তাওনিয়া। কোম্পানিটির নিট মুনাফা হয়েছে ৬০৯ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন রিয়াল। যদিও অঙ্কটি বড়, আগের বছরের ৭২৯ দশমিক ১১ মিলিয়ন রিয়ালের তুলনায় মুনাফা কমেছে ১৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। প্রকৌশল ও জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের দাবি স্বীকৃত হওয়ায় বিমা-সেবা ব্যয় বেড়েছে, যা কোম্পানিটির সামগ্রিক ফলাফলে চাপ তৈরি করেছে।

তৃতীয় অবস্থানে থাকা আল রাজহি তাকাফুলের মুনাফা হয়েছে ২০৭ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন রিয়াল। এক বছর আগে যা ছিল প্রায় ২০২ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন রিয়াল। অর্থাৎ কোম্পানিটির মুনাফা বেড়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ। মোটর, চিকিৎসা ও সাধারণ বিমা কার্যক্রম থেকে আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগ থেকে ভালো ফল এই প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।

২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকেও খাতটির মুনাফা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত ছিল। এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে বিমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৯২৩ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন রিয়াল। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৭৩৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন রিয়াল। ফলে এক বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয় প্রান্তিকে মুনাফা বেড়েছে ২৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১৬টি কোম্পানি নিট মুনাফা করেছে। এর মধ্যে ১১টির মুনাফা আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় বেড়েছে। অন্য কোম্পানিগুলো লোকসানে ছিল।

মুনাফা বৃদ্ধিকে কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত

অর্থ ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. সুলেইমান আল-হুমাইদ আল-খালিদি মনে করেন, প্রথমার্ধে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ মুনাফা বৃদ্ধি সাময়িক কোনো ঘটনা নয়। তাঁর মতে, সৌদি বিমা খাতে ব্যবসার ধরন ও মুনাফা অর্জনের কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি এই উন্নতির পেছনে তিনটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রথমত, বিমা-সেবা থেকে আয় বেড়েছে। প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, তুলনামূলক কার্যকর মূল্য নির্ধারণ এবং উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোর মূল ব্যবসাকে শক্তিশালী করেছে।

দ্বিতীয়ত, দাবি ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা বেড়েছে। বিমা কোম্পানির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শুধু প্রিমিয়াম সংগ্রহ বাড়লেই টেকসই মুনাফা নিশ্চিত হয় না। দাবি পরিশোধের ব্যয় এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি।

তৃতীয়ত, বিনিয়োগ পোর্টফোলিও থেকে পাওয়া আয় সামগ্রিক ফলাফলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে আল-খালিদি সতর্ক করে দিয়েছেন, পুরো খাতের ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে প্রতিটি কোম্পানির সমান সাফল্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বড় কোম্পানিগুলোর ব্যবসার পরিমাণ বেশি হওয়ায় তাদের ফলাফল পুরো খাতের সম্মিলিত পরিসংখ্যানে বড় প্রভাব ফেলে।

তাঁর মতে, এবারের ফলাফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুনাফা বৃদ্ধির সঙ্গে মূল বিমা কার্যক্রমের মানও উন্নত হয়েছে। অর্থাৎ শুধু বিনিয়োগ আয় বা অন্যান্য অ-পরিচালনামূলক উৎসের ওপর নির্ভর না করে কোম্পানিগুলো তাদের মূল বিমা ব্যবসা থেকেই ভালো ফল করার দিকে এগোচ্ছে।

দ্বিতীয়ার্ধে বাড়বে চ্যালেঞ্জ

২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধেও সৌদি বিমা খাতের ইতিবাচক ধারা বজায় থাকতে পারে বলে মনে করছেন আল-খালিদি। তবে প্রথমার্ধের তুলনায় প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কম হতে পারে।

স্বাস্থ্য ও মোটর বিমার চাহিদা বাড়তে থাকা এই খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি। একই সঙ্গে অবকাঠামো ও বিভিন্ন প্রকল্পের বিস্তার নতুন বিমা ব্যবসার সুযোগ তৈরি করছে। সৌদি অর্থনীতির সম্প্রসারণের ফলে আরও বেশি সম্পদ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিমা সুরক্ষার আওতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

জীবন বিমা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিমার মতো অপেক্ষাকৃত কম বিস্তৃত ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে নতুন পণ্য ও সেবার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাজারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিগুলোকে গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ধরনের বিমা কাভারেজ তৈরি করতে হবে।

তবে সামনে তিনটি বড় ঝুঁকি নজরে রাখতে হবে—স্বাস্থ্য বিমায় দাবি ব্যয় বৃদ্ধি, তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা এবং বিনিয়োগ আয়ে ওঠানামা। বিশেষ করে দাবি ব্যয় দ্রুত বাড়লে প্রিমিয়াম থেকে পাওয়া অতিরিক্ত আয়ও মুনাফায় পুরোপুরি প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে আগামী দিনের সফল বিমা কোম্পানি কেবল সবচেয়ে বেশি প্রিমিয়াম সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান হবে না। বরং যে প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বাড়ানোর পাশাপাশি দাবি ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে, বিমা কার্যক্রমের ফল উন্নত করতে এবং বিনিয়োগ থেকে তুলনামূলক স্থিতিশীল আয় নিশ্চিত করতে পারবে, তারাই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।

সৌদি বিমা খাত তাই এখন শুধু বাজার সম্প্রসারণের দিকে তাকিয়ে নেই। ব্যবসার প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই মুনাফায় রূপান্তর করাই হয়ে উঠছে বড় লক্ষ্য। ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধের আর্থিক ফলাফল সেই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হয়েছে, তার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | সাব-এডিটর । GLive24.com

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর