জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

টেস্টে নো বল ঠেকাতে জরিমানার প্রস্তাব গাভাস্কারের

টেস্ট ক্রিকেটে নো বলের প্রবণতা কমাতে সীমিত ওভারের ক্রিকেটের মতো ফ্রি হিট চালুর প্রস্তাব উঠলেও সেই ধারণার বিরোধিতা করেছেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক সুনীল গাভাস্কার। তাঁর মতে, টেস্টে নো বলের পর ফ্রি হিট চালু করলে শাস্তির বদলে ব্যাটিং দলই বাড়তি সুবিধা পাবে। এতে বোলারের একটি ভুলের প্রভাব আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের স্পিন বোলিং কোচ সাইরাজ বাহুতুলে টেস্ট ক্রিকেটে নো বলের সমস্যা কমানোর উপায় হিসেবে ফ্রি হিটের কথা বলেছেন। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে নো বলের পর ফ্রি হিট ব্যাটসম্যানকে আক্রমণাত্মক শট খেলার সুযোগ দেয় এবং বোলারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে। কিন্তু গাভাস্কারের দৃষ্টিতে পাঁচ দিনের ক্রিকেটের কাঠামো ও কৌশল ভিন্ন। তাই একই শাস্তি টেস্টে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভারতের দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে নো বলের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। বিশেষ করে রবীন্দ্র জাদেজা ও অভিষিক্ত সারাংশ জৈনের বোলিংয়ে নিয়ম ভাঙার ঘটনা চোখে পড়ে। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ভারতীয় বোলাররা মোট ১৩টি নো বল করেন। এর মধ্যে জাদেজা ও সারাংশ জৈন মিলে করেন ১১টি। অর্থাৎ দলের মোট নো বলের বড় অংশই এসেছে এই দুই স্পিনারের কাছ থেকে।

জাদেজার পরিসংখ্যানও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম টেস্টে তিনি চারটি নো বল করেন। দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে তাঁর নো বল ছিল তিনটি, আর দ্বিতীয় ইনিংসে আরও একটি। ফলে দুই ম্যাচের সিরিজেই তাঁর নো বলের সংখ্যা দাঁড়ায় আটটি।

২০২১ সাল থেকে টেস্ট ক্রিকেটে জাদেজার নো বলের সংখ্যা ৮৮। একই সময়ের হিসাবে নো বল করা স্পিনারদের তালিকায় তাঁর পরেই আছেন পাকিস্তানের নোমান আলী, ৪০টি নিয়ে। শ্রীলঙ্কার লাসিথ এম্বুলদেনিয়া করেছেন ৩৩টি এবং ইংল্যান্ডের জ্যাক লিচের নো বলের সংখ্যা ১৯টি। এই ব্যবধান দেখায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাদেজার নো বলের হার অন্য কয়েকজন পরিচিত স্পিনারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

গাভাস্কারের উদ্বেগের জায়গাটি শুধু অতিরিক্ত রান নয়। টেস্টে নো বলের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, গুরুত্বপূর্ণ একটি উইকেটও বাতিল হয়ে যেতে পারে। কোনো বোলার যদি নো বল করে একই ডেলিভারিতে ব্যাটসম্যানকে আউট করেন, নিয়ম অনুযায়ী সেই আউট কার্যকর থাকে না। ফলে যে মুহূর্তে বোলিং দল মনে করে তারা গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছে, সেটিই মুহূর্তের মধ্যে হতাশায় পরিণত হতে পারে। দীর্ঘ পাঁচ দিনের ম্যাচে এমন একটি ঘটনা ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এই কারণেই গাভাস্কার ফ্রি হিটের বদলে আর্থিক শাস্তির কথা বলেছেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো বোলার প্রথমবার নো বল করলে নির্দিষ্ট অঙ্কের জরিমানা করা যেতে পারে। একই বোলার আবার নো বল করলে আগের জরিমানার দ্বিগুণ অর্থ দিতে হবে। অর্থাৎ একই ভুল পুনরাবৃত্তি হলে শাস্তির মাত্রাও ধাপে ধাপে বাড়বে।

শুধু বোলারকে দায়ী করতেই চান না গাভাস্কার। তাঁর মতে, বোলিং কোচকেও আর্থিকভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা যেতে পারে। কোনো বোলারকে যে পরিমাণ জরিমানা করা হবে, তার অর্ধেক পরিমাণ বোলিং কোচকেও দিতে হতে পারে। এতে অনুশীলন, রানআপ, ক্রিজের অবস্থান এবং বোলিংয়ের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কোচ ও বোলারের মধ্যে আরও নিবিড় নজরদারি তৈরি হতে পারে।

ফ্রি হিটের বিরোধিতা করতে গিয়ে গাভাস্কার টেস্ট ক্রিকেটে সাম্প্রতিক কিছু পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বাউন্সারের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠের সীমানা তুলনামূলক ছোট হওয়ার মতো পরিবর্তনের কারণে ব্যাটসম্যানরা কিছু ক্ষেত্রে আগের চেয়ে সুবিধা পাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে নো বলের পর আবার ফ্রি হিটের সুযোগ দিলে ব্যাটিং দলের জন্য সুবিধা আরও বাড়তে পারে। তাঁর চোখে, এতে নো বলের শাস্তি কার্যত বোলিং দলের জন্য দ্বিগুণ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

গাভাস্কারের ভাবনায় শাস্তির পরিধি অবশ্য শুধু নো বলেই সীমাবদ্ধ নয়। ফিল্ডিংয়ের সময় থ্রোর পেছনে যথাযথ ব্যাকআপ না রাখা কিংবা অসতর্কতার কারণে দলের ক্ষতি হওয়ার মতো ঘটনাকেও জরিমানার আওতায় আনার কথা বলেছেন তিনি। কোন কোন ভুলের জন্য জরিমানা হবে, তা খেলোয়াড়দের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে নির্ধারণ করা যেতে পারে বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

তাঁর প্রস্তাবে জরিমানার অর্থ ব্যবহারের বিষয়টিও আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। এই অর্থ দলের সাধারণ তহবিলে জমা না রেখে খেলোয়াড়দের বিদায়ের আগে শেষ নৈশভোজ বা কোনো দলীয় আয়োজনে ব্যয় করার ধারণা দিয়েছেন তিনি। এতে জরিমানা শুধু শাস্তি হিসেবে না থেকে দলের ভেতরে নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে এক ধরনের সামাজিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ চাপও তৈরি করতে পারে।

টেস্ট ক্রিকেটে নো বল কমানোর ক্ষেত্রে অবশ্য আর্থিক জরিমানাই একমাত্র সমাধান নয়। একজন বোলারের পা বারবার ক্রিজের সামনে চলে আসার পেছনে কারিগরি ত্রুটি, রানআপের ছন্দে সমস্যা, ক্লান্তি কিংবা ম্যাচের চাপ—বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই নিয়মিত ভিডিও বিশ্লেষণ, অনুশীলনে ক্রিজের অবস্থান পর্যবেক্ষণ এবং ম্যাচ চলাকালে সতর্কতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে স্পিনারদের ক্ষেত্রে সামান্য পা এগিয়ে গেলেই নো বল হয়ে যেতে পারে। অথচ সেই বলেই যদি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট আসে, পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। তাই টেস্টে নো বলের সংখ্যা কমানো শুধু বোলারের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে বোলিং কোচ, অধিনায়ক এবং পুরো দলের প্রস্তুতিও জড়িত।

বাহুতুলের ফ্রি হিটের প্রস্তাব যেখানে নো বলকে সরাসরি ব্যাটিং দলের জন্য শাস্তিতে রূপান্তর করতে চায়, সেখানে গাভাস্কারের পরিকল্পনা জোর দিচ্ছে বোলার ও কোচের দায়বদ্ধতার ওপর। টেস্ট ক্রিকেটে কোন পদ্ধতি বেশি কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয়ে দুই মতের মিল রয়েছে—নো বলের মতো সহজে এড়ানো যায় এমন ভুল কমানো জরুরি। কারণ পাঁচ দিনের ক্রিকেটে একটি মাত্র ভুলও কখনো কখনো একটি ম্যাচের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | সাব-এডিটর । GLive24.com

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর